Dr. Sajib Saha

ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য সহজ ভাষায়

হঠাৎ ঘর ঘুরছে মনে হচ্ছে। বিছানা থেকে উঠতে গেলেই চারপাশ দুলছে। অনেকেই তখন ভাবেন প্রেশার কমে গেছে, নয়তো শরীর দুর্বল। কিন্তু সব মাথা ঘোরা এক নয়। কিছু মাথা ঘোরা কানের ভেতরের ছোট একটা সমস্যা থেকে হয়, আর কিছু আসে মস্তিষ্কের সমস্যা থেকে। দুটোর চিকিৎসা আলাদা, ঝুঁকিও আলাদা।

এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব ভার্টিগো কত প্রকার, পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য কী, আর কোন লক্ষণ দেখলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।

ভার্টিগো আসলে কী? মাথা ঘোরা আর ভার্টিগো কি একই?

ভার্টিগো কোনো আলাদা রোগ নয়। এটা একটা লক্ষণ। রোগী অনুভব করেন, তিনি নিজে ঘুরছেন, অথবা চারপাশের সবকিছু ঘুরছে। চোখ বন্ধ করলেও এই অনুভূতি থাকতে পারে।

সাধারণ মাথা ঘোরা বা ডিজিনেস একটু অন্যরকম। সেখানে মনে হয় মাথা হালকা লাগছে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে, দাঁড়াতে গেলে পড়ে যাব। এটা প্রেশার কমে যাওয়া, রক্তশূন্যতা, পানিশূন্যতা, না খেয়ে থাকা বা দুশ্চিন্তা থেকেও হতে পারে।

সহজ করে বললে:

  • ভার্টিগো: ঘোরার অনুভূতি, ঘর বা নিজের শরীর পাক খাচ্ছে মনে হয়।
  • সাধারণ মাথা ঘোরা: হালকা লাগা, ঝাপসা লাগা, টলমল ভাব।

আপনার সমস্যাটা কোনটা, সেটা ডাক্তারকে ঠিকমতো বলতে পারলে রোগ ধরা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ভার্টিগো কত প্রকার? সংক্ষেপে উত্তর

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভার্টিগোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

  1. পেরিফেরাল ভার্টিগো: সমস্যা কানের ভেতরের ভারসাম্য অংশে, অথবা কান থেকে মস্তিষ্কে যাওয়া স্নায়ুতে।
  2. সেন্ট্রাল ভার্টিগো: সমস্যা মস্তিষ্কে, বিশেষ করে ব্রেনস্টেম বা সেরিবেলামে।

বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই ভার্টিগো পেরিফেরাল ধরনের। এটা তুলনামূলক কম বিপজ্জনক এবং সঠিক চিকিৎসায় ভালো হয়। সেন্ট্রাল ভার্টিগো কম দেখা যায়, কিন্তু এটা গুরুতর কিছুর ইঙ্গিত হতে পারে। তাই দুটোকে আলাদা করে চেনা খুব জরুরি।

পেরিফেরাল ভার্টিগো কী?

আমাদের দুই কানের ভেতরে একটা ছোট ভারসাম্য ব্যবস্থা আছে, যাকে ভেস্টিবুলার সিস্টেম বলে। এটা মস্তিষ্ককে প্রতি মুহূর্তে জানায়, আপনার মাথা কোন দিকে নড়ছে। এই ব্যবস্থা বা এর স্নায়ুতে সমস্যা হলে যে ভার্টিগো হয়, সেটাই পেরিফেরাল ভার্টিগো।

এর সাধারণ কারণগুলো:

  • BPPV: কানের ভেতরের ছোট ক্যালসিয়াম কণা জায়গা থেকে সরে গেলে হয়। মাথা ঘোরালে বা বিছানায় পাশ ফিরলে কয়েক সেকেন্ড থেকে এক-দুই মিনিটের জন্য মাথা ঘোরে। এটাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিস্তারিত পড়ুন BPPV চিকিৎসা পেজে।
  • ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস ও ল্যাবিরিনথাইটিস: সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের পর হয়। হঠাৎ প্রচণ্ড ঘূর্ণি শুরু হয়, সঙ্গে বমি। কয়েক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
  • মেনিয়ারস ডিজিজ: মাথা ঘোরার সঙ্গে কানে শোঁ শোঁ শব্দ, কান ভারী লাগা এবং শুনতে কষ্ট হয়। আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা চলে। এ নিয়ে আলাদা লেখা আছে মেনিয়ারস ডিজিজ চিকিৎসা পেজে।
  • কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মাথায় আঘাত।

পেরিফেরাল ভার্টিগোর চেনা লক্ষণ:

  • ঘূর্ণি খুব তীব্র হয়, কিন্তু সাধারণত কিছুক্ষণ পর কমে যায়
  • মাথা নড়ালে বা পাশ ফিরলে বাড়ে
  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • কানে শব্দ, কান ভরাট লাগা বা শ্রবণ কমে যাওয়া
  • হাতে-পায়ে দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো কোনো স্নায়বিক লক্ষণ থাকে না

সেন্ট্রাল ভার্টিগো কী?

সেন্ট্রাল ভার্টিগোতে সমস্যা কানে থাকে না। থাকে মস্তিষ্কের সেই অংশে, যেটা ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত ব্রেনস্টেম বা সেরিবেলামে।

এর সম্ভাব্য কারণ:

  • স্ট্রোক, বিশেষ করে মস্তিষ্কের পেছনের অংশে
  • মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস
  • সেরিবেলামে টিউমার বা সংক্রমণ
  • মাথায় গুরুতর আঘাত
  • মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা
  • ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন (কিছু চিকিৎসক একে সেন্ট্রাল ধরনের তালিকায় রাখেন, তবে এটা সাধারণত জীবনঝুঁকির নয় এবং চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়)

সেন্ট্রাল ভার্টিগোর সতর্ক লক্ষণ:

  • হঠাৎ শুরু হয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চরম পর্যায়ে পৌঁছায়
  • ঘূর্ণি থামে না, মাথা নড়ালেও না নড়ালেও চলতে থাকে
  • নতুন ধরনের তীব্র মাথাব্যথা, বিশেষ করে ঘাড়ের দিকে বা মাথার পেছনে
  • হাঁটতে গেলে টলে পড়ে যাওয়া, এমনকি বসে থাকতেও ভারসাম্য ঠিক না থাকা
  • দুটো জিনিস দেখা (ডাবল ভিশন), কথা জড়িয়ে যাওয়া, গিলতে কষ্ট
  • হাত বা পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তা, মুখ বেঁকে যাওয়া

পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য এক নজরে

বিষয় পেরিফেরাল ভার্টিগো সেন্ট্রাল ভার্টিগো
সমস্যার জায়গা কানের ভেতরের ভারসাম্য অংশ বা স্নায়ু মস্তিষ্ক (ব্রেনস্টেম, সেরিবেলাম)
কতটা দেখা যায় অনেক বেশি কম
ঘূর্ণির ধরন তীব্র, কিন্তু কিছুক্ষণ বা নির্দিষ্ট সময় পর কমে তুলনামূলক কম তীব্র হতে পারে, কিন্তু টানা থাকে
মাথা নড়ালে সাধারণত বাড়ে নড়ালেও না নড়ালেও একই থাকতে পারে
বমি খুব বেশি থাকতে পারে, তবে কম হতেও পারে
কানের লক্ষণ শব্দ, ভারী ভাব, শ্রবণ কমা হতে পারে সাধারণত থাকে না
স্নায়বিক লক্ষণ থাকে না প্রায়ই থাকে (ডাবল ভিশন, কথা জড়ানো, দুর্বলতা)
হাঁটার ক্ষমতা কষ্ট হয়, কিন্তু সাধারণত হাঁটা যায় অনেক সময় দাঁড়ানোই কঠিন
ঝুঁকি তুলনামূলক কম বেশি, দ্রুত পরীক্ষা দরকার

একটা বিষয় মনে রাখবেন। এই টেবিল শুধু বোঝার সুবিধার জন্য। নিজে নিজে রোগ ঠিক করার জন্য নয়। অনেক সময় শুধু লক্ষণ দেখে দুটো আলাদা করা বিশেষজ্ঞের জন্যও কঠিন। তাই পরীক্ষা লাগে।

কোন কানের কারণে মাথা ঘোরে, বুঝবেন কীভাবে?

সাধারণত একটা কান বেশি দুর্বল থাকে বা সমস্যায় থাকে। কিছু ইঙ্গিত দেখে আন্দাজ পাওয়া যায়:

  • যে পাশে শ্রবণ কমেছে বা কানে শব্দ হচ্ছে, সেই কানের সমস্যা হতে পারে
  • কোন দিকে ফিরে শুলে মাথা ঘোরে, সেটাও একটা ক্লু দেয়

তবে আসল উত্তর দেয় পরীক্ষা। যেমন VNG আর vHIT। কোন কান আক্রান্ত, তা নিয়ে আমরা পরের লেখায় আলাদা করে বিস্তারিত দেখব।

কখন দেরি না করে জরুরি বিভাগে যাবেন?

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ মাথা ঘোরার সঙ্গে থাকলে অপেক্ষা করবেন না। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:

  • মুখ এক দিকে বেঁকে যাওয়া
  • একটি হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া বা অসাড় লাগা
  • কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া বা কথা বলতে না পারা
  • হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বিশেষ করে জীবনে প্রথমবার এমন
  • দুটো করে দেখা বা হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া
  • দাঁড়াতে বা বসে থাকতেও না পারা
  • বুকে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। “একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে” ভেবে বসে থাকবেন না।

ডাক্তার কীভাবে বোঝেন এটা কোন ধরনের ভার্টিগো?

ভালো ডাক্তার প্রথমে আপনার কথা মন দিয়ে শোনেন। কখন শুরু হলো, কতক্ষণ থাকে, কী করলে বাড়ে, সঙ্গে আর কী লক্ষণ আছে, এই প্রশ্নগুলোতেই অনেক তথ্য মেলে। তারপর কিছু পরীক্ষা করা হয়:

  • চোখের নড়াচড়া দেখা: ভারসাম্যের সমস্যায় চোখ অস্বাভাবিকভাবে কাঁপে, একে নিস্ট্যাগমাস বলে। এর ধরন দেখে পেরিফেরাল না সেন্ট্রাল, সে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
  • হেড ইমপালস টেস্ট ও অন্যান্য বেডসাইড পরীক্ষা: কয়েক মিনিটেই করা যায়।
  • ডিক্স-হলপাইক টেস্ট: BPPV আছে কি না তা দেখার জন্য।
  • VNG, vHIT ও অন্যান্য যন্ত্রনির্ভর পরীক্ষা: কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা কেমন কাজ করছে, তা মাপে।
  • প্রয়োজনে MRI বা CT: মস্তিষ্কের সমস্যার সন্দেহ থাকলে।

কোন পরীক্ষা কখন লাগে, তা নিয়ে সাজানো আলোচনা পাবেন ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে) লেখায়। ভারসাম্য মাপার নির্দিষ্ট কিছু টেস্ট নিয়ে জানতে পারেন SVV টেস্ট ও DVA টেস্ট পেজে।

দুই ধরনের ভার্টিগোর চিকিৎসা কি এক?

না, এক নয়। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা বদলায়।

পেরিফেরাল ভার্টিগোতে:

  • BPPV হলে বিশেষ কিছু মাথা-ঘোরানোর কৌশল (যেমন এপলি ম্যানুভার) দিয়ে কণা সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এতে অনেক রোগী দ্রুত ভালো হন
  • ভাইরাসজনিত সমস্যায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও ভেস্টিবুলার থেরাপি
  • মেনিয়ারসে খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সেন্ট্রাল ভার্টিগোতে:

  • মূল কারণের চিকিৎসা আগে। স্ট্রোক হলে জরুরি চিকিৎসা, টিউমার হলে নিউরোসার্জারি বা অন্য পরিকল্পনা
  • ভেস্টিবুলার মাইগ্রেনে ট্রিগার এড়ানো ও প্রতিরোধমূলক ওষুধ

দুই ক্ষেত্রেই পরে ভেস্টিবুলার রিহ্যাবিলিটেশন কাজে লাগে। এতে মস্তিষ্ক নতুন করে ভারসাম্য সামলাতে শেখে। ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা লেখায় এর বিস্তারিত আছে।

নিজে নিজে করা ঠিক হবে না এমন কিছু কাজ

  • কারণ না জেনে ইউটিউব দেখে বারবার ম্যানুভার করা। ভুল দিকে করলে সমস্যা বাড়তে পারে
  • মাথা ঘোরার ওষুধ টানা কয়েক সপ্তাহ খেতে থাকা। এতে মস্তিষ্কের নিজে থেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আটকে যেতে পারে
  • “ওটা তো সাধারণ প্রেশারের সমস্যা” বলে উপেক্ষা করা
  • সেন্ট্রাল ভার্টিগোর লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও বাসায় অপেক্ষা করা

মাথা ঘোরার সময় ঝুঁকি কমাতে আরেকটা কথা। হঠাৎ উঠে দাঁড়াবেন না, গোসলখানায় ও সিঁড়িতে সতর্ক থাকুন, প্রয়োজনে কাউকে সঙ্গে রাখুন।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ভার্টিগো কত প্রকার? মূলত দুই প্রকার: পেরিফেরাল (কান বা ভারসাম্য স্নায়ুর সমস্যা) এবং সেন্ট্রাল (মস্তিষ্কের সমস্যা)।

কোনটা বেশি দেখা যায়? পেরিফেরাল ভার্টিগো। এর মধ্যে BPPV সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

ভার্টিগো কি নিজে নিজে সেরে যায়? কিছু ধরন সেরে যায়, যেমন ভাইরাসজনিত সমস্যা বা কিছু BPPV। কিন্তু বারবার হলে বা লক্ষণ বাড়লে অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত।

মাথা ঘোরা মানেই কি ব্রেনের সমস্যা? না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কানের সমস্যা থেকেই হয়। তবে স্নায়বিক লক্ষণ থাকলে মস্তিষ্কের সমস্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

কোন ডাক্তারের কাছে যাবেন? কারণ আলাদা করার জন্য ভার্টিগো ও ব্যালেন্স ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ কার্যকর। জরুরি লক্ষণ থাকলে আগে হাসপাতালে যান।

শেষ কথা

ভার্টিগো মানেই ভয়ের কিছু নয়। কিন্তু অবহেলার জিনিসও নয়। বেশিরভাগ সময় কারণটা কানের ভেতরেই থাকে এবং সঠিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে, সঠিক চিকিৎসায় ভালো হয়। তবে মস্তিষ্কের সমস্যার লক্ষণ থাকলে দেরি করা যাবে না। আপনার মাথা ঘোরা বারবার ফিরে আসছে, অথবা কারণ বুঝতে পারছেন না, তাহলে ভার্টিগো চিকিৎসা সম্পর্কে জানুন এবং সঠিক পরীক্ষার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।

ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫। ঢাকার বাইরে থেকে অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনও নেওয়া যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *