রোগী চেম্বারে এসে প্রায়ই একটা প্রশ্ন করেন, “ডাক্তার সাহেব, কোন কানে সমস্যা বলুন তো?” প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। কারণ মাথা ঘুরলে আমরা মাথা নিয়ে ভাবি, কান নিয়ে ভাবি না। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘোরার আসল উৎস থাকে কানের ভেতরেই।
এই লেখায় সহজ ভাষায় দেখব, কান কীভাবে ভারসাম্য ঠিক রাখে, কোন লক্ষণ দেখে কোন কানের দিকে সন্দেহ যায়, আর কোন পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়। এটাও পরিষ্কার করব, নিজে নিজে আন্দাজ কতটা কাজে লাগে এবং কোথায় থামতে হবে।
কান কীভাবে মাথা ঘোরায়?
আমাদের প্রতিটা কানের ভেতরে শুনতে সাহায্য করার অংশের পাশেই একটা ছোট ভারসাম্য যন্ত্র আছে। একে বলে ভেস্টিবুলার সিস্টেম। এর ভেতরে তিনটা প্যাঁচানো নল (সেমিসার্কুলার ক্যানাল) আর দুটো ছোট থলি থাকে। এগুলো মাথার প্রতিটা নড়াচড়া মস্তিষ্ককে জানায়।
দুই কানের সংকেত সাধারণত সমান থাকে। তাই আমরা সোজা দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু একটা কানের সংকেত হঠাৎ কমে গেলে বা এলোমেলো হয়ে গেলে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়। সে ভাবে, শরীর ঘুরছে। এখান থেকেই ঘোরার অনুভূতি আসে।
এর মানে একটা জরুরি কথা: ভারসাম্যের গোলমালে সাধারণত একটা কানই বেশি দায়ী থাকে। তাই কোন কান, সেটা জানা চিকিৎসার জন্য কাজের তথ্য। বিশেষ করে BPPV-র মতো সমস্যায় ভুল কান ধরে ব্যায়াম করলে লাভ হয় না।
প্রথম সূত্র: শ্রবণে কোনো পরিবর্তন আছে কি?
কোন কান আক্রান্ত, তা আন্দাজের সবচেয়ে সহজ সূত্র হলো শ্রবণ। নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন:
- মাথা ঘোরার সময় বা আগে কি একটা কানে শুনতে কম লাগে?
- একটা কানে কি শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা বাঁশির মতো শব্দ হয়?
- একটা কান কি ভরাট, ভারী বা চাপ ধরা মনে হয়?
- ফোনে কথা বলার সময় কোন কান দিয়ে কম শোনেন?
একটা কানে এসব লক্ষণ থাকলে সন্দেহ সেই কানের দিকেই যায়। মেনিয়ারস ডিজিজ ও ল্যাবিরিনথাইটিসে এই ধরনের কানের লক্ষণ বেশি থাকে। মেনিয়ারসে মাথা ঘোরার আগে কান ভারী লাগে এবং ঘোরা কয়েক ঘণ্টা চলতে পারে। বিস্তারিত পড়ুন মেনিয়ারস ডিজিজের চিকিৎসা পেজে।
তবে একটা কথা মনে রাখুন। কানের কোনো লক্ষণ না থাকলেও কান দায়ী হতে পারে। BPPV আর ভেস্টিবুলার নিউরাইটিসে শ্রবণ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে। তাই “আমি তো ভালো শুনি, কানে সমস্যা নেই” ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়।
দ্বিতীয় সূত্র: কোন দিকে ফিরলে ঘোরে?
এটা BPPV চেনার সবচেয়ে কাজের সূত্র। BPPV-তে কানের ভেতরের ছোট ক্যালসিয়াম কণা জায়গা থেকে সরে যায়। তাই নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে মাথা গেলেই ঘোরা শুরু হয়।
খেয়াল করুন:
- বিছানায় শুয়ে ডানে ঘুরলে কি বেশি ঘোরে, না বাঁয়ে?
- ঘুম থেকে উঠে মাথা তুললে কি ঘোরে?
- ওপরের তাকে কিছু রাখতে মাথা পেছনে নিলে কি ঘোরে?
- ঘোরা কি এক-দুই মিনিটের মধ্যে থেমে যায়?
যে দিকে শুলে ঘোরা সবচেয়ে বেশি, অনেক সময় সেই দিকের কানই আক্রান্ত থাকে। তবে এটা নিশ্চিত নিয়ম নয়। কারণ কণা কোন নলে আছে, তার ওপর নির্ভর করে লক্ষণ বদলাতে পারে। তাই শুধু শোয়ার দিক দেখে ব্যায়াম শুরু করে দেওয়া ঠিক হবে না। BPPV চিকিৎসা পেজে আমরা ব্যাখ্যা করেছি, কেন আগে পরীক্ষা করে কান নিশ্চিত করা দরকার।
তৃতীয় সূত্র: ঘোরার ধরন ও সময়
কোন কানের কথা ভাবছেন, তার সঙ্গে রোগের ধরনও বোঝা দরকার। নিচের তুলনাটা দেখুন।
| রোগ | কতক্ষণ ঘোরে | শ্রবণ | কানের অন্য লক্ষণ |
| BPPV | কয়েক সেকেন্ড থেকে ১-২ মিনিট | সাধারণত স্বাভাবিক | সাধারণত নেই |
| ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস | কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন | সাধারণত স্বাভাবিক | সাধারণত নেই |
| ল্যাবিরিনথাইটিস | কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন | কমে যেতে পারে | শব্দ, কানে চাপ |
| মেনিয়ারস ডিজিজ | কয়েক ঘণ্টা | কমে ও বাড়ে | শব্দ, ভরাট ভাব |
এই টেবিল থেকে আপনি আন্দাজ পাবেন। কিন্তু রোগ নির্ণয় এটা দিয়ে হয় না। অনেক সময় দুটো সমস্যা একসঙ্গেও থাকে।
চোখ কীভাবে কানের ঠিকানা দেয়?
একটা মজার তথ্য শুনুন। কানের ভারসাম্য যন্ত্র আর চোখের নড়াচড়া সরাসরি যুক্ত। কান বিভ্রান্ত হলে চোখ নিজে থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে নড়তে থাকে। একে নিস্ট্যাগমাস বলে।
একটা কান হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেলে চোখ সাধারণত সুস্থ কানের দিকে দ্রুত ঝাঁকুনি দেয়। ডাক্তার এই ঝাঁকুনির দিক দেখে বুঝতে পারেন কোন পাশ দুর্বল। আপনি নিজে আয়নায় এটা ধরতে পারবেন না। এর জন্য প্রশিক্ষিত চোখ লাগে, আর অনেক সময় ভিডিও গগলস লাগে।
ডাক্তার কোন কান, তা কীভাবে নিশ্চিত করেন?
অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ধাপে ধাপে এগোন। প্রথমে আপনার কথা শোনেন, তারপর কিছু পরীক্ষা করেন।
বেডসাইড পরীক্ষা: ডিক্স-হলপাইক পরীক্ষায় রোগীকে দ্রুত শুইয়ে মাথা একপাশে ঘোরানো হয়। BPPV থাকলে সেই কান ধরা পড়ে। হেড ইমপালস পরীক্ষায় মাথা দ্রুত ঘুরিয়ে চোখের প্রতিক্রিয়া দেখা হয়।
অডিওমেট্রি: দুই কানের শ্রবণ আলাদা করে মাপা হয়। একটা কানে শ্রবণ কম থাকলে সেটা বড় একটা ইঙ্গিত।
VNG: ভিডিও গগলসে চোখের নড়াচড়া রেকর্ড হয়। এর ক্যালোরিক অংশে প্রতিটা কানের ভারসাম্য নল আলাদা করে পরীক্ষা করা যায়। এতে কোন কান কতটা দুর্বল, তা দেখা যায়।
vHIT: দ্রুত মাথা ঘোরানোর সময় প্রতিটা কানের প্রতিক্রিয়া মাপা হয়। সময় কম লাগে।
VEMP: কানের ভেতরের দুটো থলির কাজ দেখা হয়।
কোন পরীক্ষা কখন লাগে, তা নিয়ে সাজানো আলোচনা আছে ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে) লেখায়। এছাড়া ভারসাম্যের নির্দিষ্ট কিছু কাজ মাপা হয় SVV টেস্ট ও DVA টেস্টে।
দুই কানেই সমস্যা থাকলে?
কিছু রোগীর দুই কানেই ভারসাম্য যন্ত্র দুর্বল হয়। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বয়স বা দীর্ঘদিনের রোগ এর কারণ হতে পারে। তখন ঘোরার চেয়ে অসাড় বা টলমলে ভাব বেশি থাকে। হাঁটার সময় বা অন্ধকারে সমস্যা বাড়ে। এমন হলে রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি বেশ কাজে লাগে। বিস্তারিত দেখুন ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা লেখায়।
কান ছাড়া অন্য কারণও আছে
মাথা ঘোরলেই কান দায়ী, এমন নয়। ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন, রক্তচাপের সমস্যা, রক্তশূন্যতা, ওষুধের প্রভাব, ঘাড়ের সমস্যা কিংবা মস্তিষ্কের রোগেও ঘোরা হতে পারে। তাই কানের লক্ষণ না মিললে নিজে নিজে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। কান আর মস্তিষ্কের পার্থক্য নিয়ে আলাদা লেখা আছে: ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য।
ঘরে বসে নিজে কী করতে পারেন?
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে একটা ছোট নোট রাখুন। এতে বিশেষজ্ঞের কাজ সহজ হয়।
- ঘোরা কখন শুরু হয়েছিল
- কতক্ষণ থাকে
- কোন কাজ করলে বাড়ে (শোয়া, ওঠা, মাথা ঘোরানো)
- কোন কানে শব্দ বা কম শোনা আছে কি না
- বমি, মাথাব্যথা বা আলোতে অস্বস্তি আছে কি না
- কী কী ওষুধ খান
ঘোরার সময় ফোনে ভিডিও করে রাখা যায় কি না, সঙ্গের কাউকে বলুন। চোখের নড়াচড়ার ভিডিও অনেক সময় ডাক্তারকে কাজের তথ্য দেয়।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
এই লক্ষণগুলোর কোনোটা থাকলে অপেক্ষা করবেন না:
- হঠাৎ একটা কানে শুনতে না পাওয়া
- ঘোরার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হাত-পা দুর্বল হওয়া (এটা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে, সরাসরি জরুরি বিভাগে যান)
- তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে ঘোরা
- মাথায় আঘাতের পর ঘোরা
- বারবার একই সমস্যা ফিরে আসা
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডান কানের সমস্যায় কি ডান দিকে ঘোরে? সব সময় নয়। BPPV-তে যে দিকে শুলে ঘোরে, অনেক সময় সেই কানেই কণা থাকে। কিন্তু একেক রোগে একেক রকম হয়। তাই পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত বলা যায় না।
একটা কানের সমস্যা কি অন্য কানেও ছড়ায়? BPPV সাধারণত একটা কানে হয়, তবে কখনো দুই কানেও হতে পারে। মেনিয়ারস কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে অন্য কানেও দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ফলো-আপ তাই দরকার।
কানে শব্দ থাকলেই কি মেনিয়ারস? না। কানে শব্দ আরও অনেক কারণে হয়। মেনিয়ারসে শব্দের সঙ্গে ঘোরা আর শ্রবণ কমা, এই তিনটা মিলে থাকে।
কান পরিষ্কার করলে কি মাথা ঘোরা সারে? কানের ময়লা শুনতে সমস্যা করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ভার্টিগোর কারণ ভেতরের কানে, যেখানে ময়লা পৌঁছায় না। তাই শুধু কান পরিষ্কার করে ঘোরা সারার আশা করা ঠিক নয়।
কোন ডাক্তার দেখাব? ঘোরা বারবার হলে ভার্টিগো ও ব্যালেন্স ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ সবচেয়ে কার্যকর, কারণ এখানে বিশেষ পরীক্ষার যন্ত্র ও অভিজ্ঞতা দুটোই লাগে।
শেষ কথা
কোন কানের কারণে মাথা ঘোরে, তার ইঙ্গিত আপনার নিজের লক্ষণেই লুকিয়ে থাকে। শ্রবণ, শব্দ, শোয়ার দিক আর ঘোরার সময়, এই চারটা খেয়াল করলে আন্দাজ অনেকটা পরিষ্কার হয়। তবে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা লাগবে, আর সঠিক কান জেনে চিকিৎসা নিলে ফলও ভালো আসে। আপনার ঘোরা বারবার ফিরে আসছে, কিংবা কারণ বুঝতে পারছেন না? ভার্টিগো চিকিৎসা পেজ থেকে জানুন, আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সঠিক পরীক্ষা করিয়ে নিন।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫।
রোগী চেম্বারে এসে প্রায়ই একটা প্রশ্ন করেন, “ডাক্তার সাহেব, কোন কানে সমস্যা বলুন তো?” প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক। কারণ মাথা ঘুরলে আমরা মাথা নিয়ে ভাবি, কান নিয়ে ভাবি না। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘোরার আসল উৎস থাকে কানের ভেতরেই।
এই লেখায় সহজ ভাষায় দেখব, কান কীভাবে ভারসাম্য ঠিক রাখে, কোন লক্ষণ দেখে কোন কানের দিকে সন্দেহ যায়, আর কোন পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়। এটাও পরিষ্কার করব, নিজে নিজে আন্দাজ কতটা কাজে লাগে এবং কোথায় থামতে হবে।
কান কীভাবে মাথা ঘোরায়?
আমাদের প্রতিটা কানের ভেতরে শুনতে সাহায্য করার অংশের পাশেই একটা ছোট ভারসাম্য যন্ত্র আছে। একে বলে ভেস্টিবুলার সিস্টেম। এর ভেতরে তিনটা প্যাঁচানো নল (সেমিসার্কুলার ক্যানাল) আর দুটো ছোট থলি থাকে। এগুলো মাথার প্রতিটা নড়াচড়া মস্তিষ্ককে জানায়।
দুই কানের সংকেত সাধারণত সমান থাকে। তাই আমরা সোজা দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু একটা কানের সংকেত হঠাৎ কমে গেলে বা এলোমেলো হয়ে গেলে মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়। সে ভাবে, শরীর ঘুরছে। এখান থেকেই ঘোরার অনুভূতি আসে।
এর মানে একটা জরুরি কথা: ভারসাম্যের গোলমালে সাধারণত একটা কানই বেশি দায়ী থাকে। তাই কোন কান, সেটা জানা চিকিৎসার জন্য কাজের তথ্য। বিশেষ করে BPPV-র মতো সমস্যায় ভুল কান ধরে ব্যায়াম করলে লাভ হয় না।
প্রথম সূত্র: শ্রবণে কোনো পরিবর্তন আছে কি?
কোন কান আক্রান্ত, তা আন্দাজের সবচেয়ে সহজ সূত্র হলো শ্রবণ। নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন:
- মাথা ঘোরার সময় বা আগে কি একটা কানে শুনতে কম লাগে?
- একটা কানে কি শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা বাঁশির মতো শব্দ হয়?
- একটা কান কি ভরাট, ভারী বা চাপ ধরা মনে হয়?
- ফোনে কথা বলার সময় কোন কান দিয়ে কম শোনেন?
একটা কানে এসব লক্ষণ থাকলে সন্দেহ সেই কানের দিকেই যায়। মেনিয়ারস ডিজিজ ও ল্যাবিরিনথাইটিসে এই ধরনের কানের লক্ষণ বেশি থাকে। মেনিয়ারসে মাথা ঘোরার আগে কান ভারী লাগে এবং ঘোরা কয়েক ঘণ্টা চলতে পারে। বিস্তারিত পড়ুন মেনিয়ারস ডিজিজের চিকিৎসা পেজে।
তবে একটা কথা মনে রাখুন। কানের কোনো লক্ষণ না থাকলেও কান দায়ী হতে পারে। BPPV আর ভেস্টিবুলার নিউরাইটিসে শ্রবণ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে। তাই “আমি তো ভালো শুনি, কানে সমস্যা নেই” ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়।
দ্বিতীয় সূত্র: কোন দিকে ফিরলে ঘোরে?
এটা BPPV চেনার সবচেয়ে কাজের সূত্র। BPPV-তে কানের ভেতরের ছোট ক্যালসিয়াম কণা জায়গা থেকে সরে যায়। তাই নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে মাথা গেলেই ঘোরা শুরু হয়।
খেয়াল করুন:
- বিছানায় শুয়ে ডানে ঘুরলে কি বেশি ঘোরে, না বাঁয়ে?
- ঘুম থেকে উঠে মাথা তুললে কি ঘোরে?
- ওপরের তাকে কিছু রাখতে মাথা পেছনে নিলে কি ঘোরে?
- ঘোরা কি এক-দুই মিনিটের মধ্যে থেমে যায়?
যে দিকে শুলে ঘোরা সবচেয়ে বেশি, অনেক সময় সেই দিকের কানই আক্রান্ত থাকে। তবে এটা নিশ্চিত নিয়ম নয়। কারণ কণা কোন নলে আছে, তার ওপর নির্ভর করে লক্ষণ বদলাতে পারে। তাই শুধু শোয়ার দিক দেখে ব্যায়াম শুরু করে দেওয়া ঠিক হবে না। BPPV চিকিৎসা পেজে আমরা ব্যাখ্যা করেছি, কেন আগে পরীক্ষা করে কান নিশ্চিত করা দরকার।
তৃতীয় সূত্র: ঘোরার ধরন ও সময়
কোন কানের কথা ভাবছেন, তার সঙ্গে রোগের ধরনও বোঝা দরকার। নিচের তুলনাটা দেখুন।
| রোগ | কতক্ষণ ঘোরে | শ্রবণ | কানের অন্য লক্ষণ |
| BPPV | কয়েক সেকেন্ড থেকে ১-২ মিনিট | সাধারণত স্বাভাবিক | সাধারণত নেই |
| ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস | কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন | সাধারণত স্বাভাবিক | সাধারণত নেই |
| ল্যাবিরিনথাইটিস | কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন | কমে যেতে পারে | শব্দ, কানে চাপ |
| মেনিয়ারস ডিজিজ | কয়েক ঘণ্টা | কমে ও বাড়ে | শব্দ, ভরাট ভাব |
এই টেবিল থেকে আপনি আন্দাজ পাবেন। কিন্তু রোগ নির্ণয় এটা দিয়ে হয় না। অনেক সময় দুটো সমস্যা একসঙ্গেও থাকে।
চোখ কীভাবে কানের ঠিকানা দেয়?
একটা মজার তথ্য শুনুন। কানের ভারসাম্য যন্ত্র আর চোখের নড়াচড়া সরাসরি যুক্ত। কান বিভ্রান্ত হলে চোখ নিজে থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে নড়তে থাকে। একে নিস্ট্যাগমাস বলে।
একটা কান হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেলে চোখ সাধারণত সুস্থ কানের দিকে দ্রুত ঝাঁকুনি দেয়। ডাক্তার এই ঝাঁকুনির দিক দেখে বুঝতে পারেন কোন পাশ দুর্বল। আপনি নিজে আয়নায় এটা ধরতে পারবেন না। এর জন্য প্রশিক্ষিত চোখ লাগে, আর অনেক সময় ভিডিও গগলস লাগে।
ডাক্তার কোন কান, তা কীভাবে নিশ্চিত করেন?
অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ধাপে ধাপে এগোন। প্রথমে আপনার কথা শোনেন, তারপর কিছু পরীক্ষা করেন।
বেডসাইড পরীক্ষা: ডিক্স-হলপাইক পরীক্ষায় রোগীকে দ্রুত শুইয়ে মাথা একপাশে ঘোরানো হয়। BPPV থাকলে সেই কান ধরা পড়ে। হেড ইমপালস পরীক্ষায় মাথা দ্রুত ঘুরিয়ে চোখের প্রতিক্রিয়া দেখা হয়।
অডিওমেট্রি: দুই কানের শ্রবণ আলাদা করে মাপা হয়। একটা কানে শ্রবণ কম থাকলে সেটা বড় একটা ইঙ্গিত।
VNG: ভিডিও গগলসে চোখের নড়াচড়া রেকর্ড হয়। এর ক্যালোরিক অংশে প্রতিটা কানের ভারসাম্য নল আলাদা করে পরীক্ষা করা যায়। এতে কোন কান কতটা দুর্বল, তা দেখা যায়।
vHIT: দ্রুত মাথা ঘোরানোর সময় প্রতিটা কানের প্রতিক্রিয়া মাপা হয়। সময় কম লাগে।
VEMP: কানের ভেতরের দুটো থলির কাজ দেখা হয়।
কোন পরীক্ষা কখন লাগে, তা নিয়ে সাজানো আলোচনা আছে ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে) লেখায়। এছাড়া ভারসাম্যের নির্দিষ্ট কিছু কাজ মাপা হয় SVV টেস্ট ও DVA টেস্টে।
দুই কানেই সমস্যা থাকলে?
কিছু রোগীর দুই কানেই ভারসাম্য যন্ত্র দুর্বল হয়। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বয়স বা দীর্ঘদিনের রোগ এর কারণ হতে পারে। তখন ঘোরার চেয়ে অসাড় বা টলমলে ভাব বেশি থাকে। হাঁটার সময় বা অন্ধকারে সমস্যা বাড়ে। এমন হলে রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি বেশ কাজে লাগে। বিস্তারিত দেখুন ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা লেখায়।
কান ছাড়া অন্য কারণও আছে
মাথা ঘোরলেই কান দায়ী, এমন নয়। ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন, রক্তচাপের সমস্যা, রক্তশূন্যতা, ওষুধের প্রভাব, ঘাড়ের সমস্যা কিংবা মস্তিষ্কের রোগেও ঘোরা হতে পারে। তাই কানের লক্ষণ না মিললে নিজে নিজে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। কান আর মস্তিষ্কের পার্থক্য নিয়ে আলাদা লেখা আছে: ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য।
ঘরে বসে নিজে কী করতে পারেন?
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে একটা ছোট নোট রাখুন। এতে বিশেষজ্ঞের কাজ সহজ হয়।
- ঘোরা কখন শুরু হয়েছিল
- কতক্ষণ থাকে
- কোন কাজ করলে বাড়ে (শোয়া, ওঠা, মাথা ঘোরানো)
- কোন কানে শব্দ বা কম শোনা আছে কি না
- বমি, মাথাব্যথা বা আলোতে অস্বস্তি আছে কি না
- কী কী ওষুধ খান
ঘোরার সময় ফোনে ভিডিও করে রাখা যায় কি না, সঙ্গের কাউকে বলুন। চোখের নড়াচড়ার ভিডিও অনেক সময় ডাক্তারকে কাজের তথ্য দেয়।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
এই লক্ষণগুলোর কোনোটা থাকলে অপেক্ষা করবেন না:
- হঠাৎ একটা কানে শুনতে না পাওয়া
- ঘোরার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা হাত-পা দুর্বল হওয়া (এটা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে, সরাসরি জরুরি বিভাগে যান)
- তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে ঘোরা
- মাথায় আঘাতের পর ঘোরা
- বারবার একই সমস্যা ফিরে আসা
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডান কানের সমস্যায় কি ডান দিকে ঘোরে? সব সময় নয়। BPPV-তে যে দিকে শুলে ঘোরে, অনেক সময় সেই কানেই কণা থাকে। কিন্তু একেক রোগে একেক রকম হয়। তাই পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত বলা যায় না।
একটা কানের সমস্যা কি অন্য কানেও ছড়ায়? BPPV সাধারণত একটা কানে হয়, তবে কখনো দুই কানেও হতে পারে। মেনিয়ারস কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে অন্য কানেও দেখা দিতে পারে। নিয়মিত ফলো-আপ তাই দরকার।
কানে শব্দ থাকলেই কি মেনিয়ারস? না। কানে শব্দ আরও অনেক কারণে হয়। মেনিয়ারসে শব্দের সঙ্গে ঘোরা আর শ্রবণ কমা, এই তিনটা মিলে থাকে।
কান পরিষ্কার করলে কি মাথা ঘোরা সারে? কানের ময়লা শুনতে সমস্যা করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ভার্টিগোর কারণ ভেতরের কানে, যেখানে ময়লা পৌঁছায় না। তাই শুধু কান পরিষ্কার করে ঘোরা সারার আশা করা ঠিক নয়।
কোন ডাক্তার দেখাব? ঘোরা বারবার হলে ভার্টিগো ও ব্যালেন্স ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ সবচেয়ে কার্যকর, কারণ এখানে বিশেষ পরীক্ষার যন্ত্র ও অভিজ্ঞতা দুটোই লাগে।
শেষ কথা
কোন কানের কারণে মাথা ঘোরে, তার ইঙ্গিত আপনার নিজের লক্ষণেই লুকিয়ে থাকে। শ্রবণ, শব্দ, শোয়ার দিক আর ঘোরার সময়, এই চারটা খেয়াল করলে আন্দাজ অনেকটা পরিষ্কার হয়। তবে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা লাগবে, আর সঠিক কান জেনে চিকিৎসা নিলে ফলও ভালো আসে। আপনার ঘোরা বারবার ফিরে আসছে, কিংবা কারণ বুঝতে পারছেন না? ভার্টিগো চিকিৎসা পেজ থেকে জানুন, আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সঠিক পরীক্ষা করিয়ে নিন।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫।