আপনি চেয়ারে বসে আছেন। হঠাৎ চারপাশ ঘুরতে শুরু করল। পেট গুলিয়ে উঠল, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। কয়েক সেকেন্ডে মনে হলো, এই বুঝি পড়ে যাব। এমন অভিজ্ঞতা যাঁর হয়েছে, তিনি জানেন কতটা ভয় লাগে।
ভালো খবর হলো, হঠাৎ মাথা ঘোরার বেশিরভাগ কারণই ভয়ের নয়, আর চিকিৎসা আছে। খারাপ খবর হলো, কয়েকটা কারণ গুরুতর, আর সেগুলো দেরি সহ্য করে না। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব, কী কী কারণে হঠাৎ মাথা ঘোরার আক্রমণ আসে, কোনটা কেমন লক্ষণ দেয়, আর আক্রমণের মুহূর্তে কী করবেন।
হঠাৎ মাথা ঘোরা মানে কি সব সময় ভার্টিগো?
না। মানুষ “মাথা ঘোরা” বলতে দুই-তিন রকম অনুভূতি বোঝায়।
- ভার্টিগো: নিজে বা চারপাশ ঘুরছে মনে হয়।
- হালকা লাগা: মাথা ফাঁকা লাগে, চোখে অন্ধকার নামে, যেন অজ্ঞান হয়ে যাব।
- অসাড় বা টলমল ভাব: হাঁটতে গেলে ভারসাম্য থাকে না, ঘূর্ণি নেই।
আপনার ঠিক কোনটা হচ্ছে, সেটা ডাক্তারকে বলতে পারলে কারণ খোঁজা অনেক সহজ হয়। ভার্টিগোর ধরন নিয়ে আলাদা লেখা আছে: ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য।
কানের ভেতরের কারণ (সবচেয়ে সাধারণ)
হঠাৎ ঘূর্ণির আক্রমণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণ কানের ভেতরের ভারসাম্য অংশ। নিচের চারটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
১. BPPV
কানের ভেতরে ছোট ছোট ক্যালসিয়াম কণা থাকে। এগুলো জায়গা থেকে সরে গেলে মাথা নড়াতেই ঘূর্ণি শুরু হয়। বিছানায় পাশ ফেরা, ঘুম থেকে উঠে বসা, ওপরে তাকানো বা মাথা নিচু করার সময় আক্রমণ আসে। ঘোরা সাধারণত এক-দুই মিনিটের মধ্যে থেমে যায়। এই সমস্যাকে বিশেষ কিছু মাথা-ঘোরানোর কৌশল দিয়ে ঠিক করা যায়। বিস্তারিত পড়ুন BPPV চিকিৎসা পেজে।
২. ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস ও ল্যাবিরিনথাইটিস
সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের পর কানের ভারসাম্য স্নায়ু বা কানের ভেতরের অংশ ফুলে যায়। তখন হঠাৎ তীব্র ঘূর্ণি শুরু হয়, সঙ্গে বমি। এই ঘোরা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন চলতে পারে। ল্যাবিরিনথাইটিসে শ্রবণও কমে যেতে পারে।
৩. মেনিয়ারস ডিজিজ
এতে ঘূর্ণির সঙ্গে কানে শোঁ শোঁ শব্দ, কান ভারী লাগা আর শ্রবণ কমে যাওয়া, এই তিনটা মিলে আসে। আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা চলে। মেনিয়ারস ডিজিজ চিকিৎসা পেজে এ নিয়ে বিস্তারিত আছে।
৪. কানে ময়লা, সংক্রমণ বা চাপের পরিবর্তন
কান বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঠান্ডা লেগে কানের চাপ বদলানো বা কানে পানি ঢোকার পর ঘোরা শুরু হতে পারে। এগুলো সাধারণত সাময়িক, তবে ব্যথা, পুঁজ বা শ্রবণ কমলে ডাক্তার দেখান।
মাইগ্রেন ও অন্যান্য স্নায়ুর কারণ
৫. ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন
এটা অনেকের কাছেই অজানা। মাথাব্যথা না থাকলেও মাইগ্রেন ঘূর্ণি তৈরি করতে পারে। আলো বা শব্দে অস্বস্তি, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, কিছু খাবার বা হরমোনের পরিবর্তন আক্রমণ ডেকে আনে। আক্রমণ কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা বা দিনও চলতে পারে। কারণ ধরা না পড়লে অনেকে বছরের পর বছর ভুল চিকিৎসা নেন। এ নিয়ে দেখুন ভেস্টিবুলার ডিজঅর্ডার চিকিৎসা।
৬. স্ট্রোক বা টিআইএ (ছোট স্ট্রোক)
এই কারণটা কম হলেও সবচেয়ে বিপজ্জনক। মস্তিষ্কের পেছনের অংশে রক্ত চলাচল কমে গেলে হঠাৎ ঘূর্ণি আসতে পারে। সঙ্গে থাকতে পারে কথা জড়িয়ে যাওয়া, একটা হাত-পা দুর্বল হওয়া, দুটো করে দেখা, মুখ বেঁকে যাওয়া বা দাঁড়াতে না পারা। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান বা হৃদরোগ থাকলে ঝুঁকি বেশি। এ রকম লক্ষণ থাকলে এক মিনিটও অপেক্ষা করবেন না।
৭. মাথায় আঘাত
আঘাতের পর ঘোরা শুরু হলে কানের ভেতরের কণা সরে যেতে পারে, আবার মস্তিষ্কেও সমস্যা হতে পারে। বমি, ঝিমুনি বা তীব্র মাথাব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
শরীরের সাধারণ অবস্থার কারণ
সব ঘূর্ণি কান বা মস্তিষ্ক থেকে আসে না। কখনো শরীরের সাধারণ কোনো সমস্যা মাথা ঘোরার আসল কারণ।
৮. রক্তচাপ কমে যাওয়া
বসা বা শোয়া থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কিছুক্ষণের জন্য কমে যেতে পারে। তখন চোখের সামনে অন্ধকার নামে। এতে ঘূর্ণির অনুভূতি কম থাকে, হালকা লাগাটাই বেশি থাকে। বয়স্ক মানুষ বা প্রেসারের ওষুধ খাওয়া রোগীদের এটা বেশি হয়।
৯. পানিশূন্যতা, রক্তশূন্যতা ও রক্তে চিনি কমে যাওয়া
গরমে ঘাম, ডায়রিয়া, রোজা বা অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা, এসবের পর মাথা ঘুরতে পারে। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলেও একই সমস্যা হয়। ডায়াবেটিসের ওষুধ খেয়ে খাবার বাদ দিলে চিনি কমে গিয়ে ঘাম, কাঁপুনি ও মাথা ঘোরা হতে পারে।
১০. ওষুধের প্রভাব
প্রেসারের ওষুধ, ঘুমের ওষুধ, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা খিঁচুনির ওষুধে মাথা ঘোরা হতে পারে। কিছু ওষুধ আবার কানের ভারসাম্য অংশেরও ক্ষতি করতে পারে। নতুন ওষুধ শুরুর পর ঘোরা শুরু হলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না। ডাক্তারকে জানান।
১১. দুশ্চিন্তা ও প্যানিক অ্যাটাক
তীব্র দুশ্চিন্তায় শ্বাস দ্রুত হয়, বুক ধড়ফড় করে, আর মাথা ঘোরে। আবার দীর্ঘদিন মাথা ঘোরার ভয় থেকেই কিছু মানুষের মধ্যে একটা স্থায়ী টলমল ভাব তৈরি হয়। এ রকম অবস্থায় ভারসাম্য থেরাপি বেশ কাজে লাগে। দেখুন ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা।
১২. ঘাড়ের সমস্যা ও দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকানো
ঘাড়ের পেশি শক্ত হলে বা ঘাড় বাঁকা করে অনেকক্ষণ থাকলে মাথা ভারী লাগতে পারে। তবে ঘাড়ের সমস্যাকে অযথা বেশি দোষ দেবেন না। সত্যিকারের ঘূর্ণি থাকলে কানের পরীক্ষাটা আগে করিয়ে নেওয়াই ভালো।
কোন কারণে কেমন লক্ষণ: এক নজরে
| লক্ষণ | সম্ভাব্য কারণ |
| মাথা নড়ালেই কয়েক সেকেন্ড ঘোরে | BPPV |
| হঠাৎ তীব্র ঘূর্ণি, কয়েক দিন চলে, বমি | ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস |
| ঘূর্ণির সঙ্গে কানে শব্দ ও শ্রবণ কমা | মেনিয়ারস, ল্যাবিরিনথাইটিস |
| ঘূর্ণির সঙ্গে আলোতে অস্বস্তি, মাইগ্রেনের ইতিহাস | ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন |
| উঠে দাঁড়ালে চোখে অন্ধকার | রক্তচাপ কমে যাওয়া |
| ঘূর্ণির সঙ্গে কথা জড়ানো, দুর্বলতা | স্ট্রোক (জরুরি) |
এই টেবিল শুধু বোঝার সুবিধার জন্য। নিজে নিজে রোগ ঠিক করার জন্য নয়।
আক্রমণের মুহূর্তে কী করবেন?
ঘোরা শুরু হলে প্রথম কাজ হলো পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানো।
- যেখানে আছেন, সেখানেই বসে পড়ুন বা শুয়ে পড়ুন। হাঁটার চেষ্টা করবেন না।
- চোখ খুলে একটা স্থির জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকুন। অনেকের এতে ঘূর্ণি কিছুটা কমে।
- মাথা হঠাৎ নাড়াবেন না। ধীরে নড়ুন।
- পানি পান করুন, বিশেষ করে গরমে বা না খেয়ে থাকলে।
- গাড়ি চালানো, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা উঁচুতে ওঠা পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন।
- সম্ভব হলে কাউকে ডেকে নিন।
ঘোরা কমে গেলেও ভুলে যাবেন না। কখন শুরু হয়েছিল, কতক্ষণ ছিল, কী করছিলেন, সঙ্গে আর কী লক্ষণ ছিল, এগুলো লিখে রাখুন। ডাক্তার এই তথ্য থেকে অনেক কিছু বুঝতে পারেন।
কখন সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাবেন?
নিচের যেকোনো একটা লক্ষণ ঘোরার সঙ্গে থাকলে দেরি করবেন না। জরুরি বিভাগে যান।
- মুখ এক দিকে বেঁকে যাওয়া
- হাত বা পা দুর্বল বা অবশ লাগা
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- হঠাৎ দুটো করে দেখা বা দৃষ্টি কমে যাওয়া
- বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতেও না পারা
- জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা
- বুকে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি
- মাথায় আঘাতের পর ঘোরা
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটা মিনিট দামি। “একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে” ভেবে বসে থাকবেন না।
ডাক্তার কীভাবে কারণ খুঁজে বের করেন?
প্রথমে আপনার কথা শোনেন। কখন শুরু হয়, কতক্ষণ থাকে, কী করলে বাড়ে, সঙ্গে শ্রবণ বা মাথাব্যথা আছে কি না, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই অনেকটা কারণ বোঝা যায়। এরপর চোখের নড়াচড়া, ভারসাম্য ও কানের পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনে VNG, vHIT, অডিওমেট্রি বা MRI করানো হয়। কোন পরীক্ষা কখন লাগে, তা জানতে পড়ুন ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে)।
আবার যেন আক্রমণ না আসে, তার জন্য কী করবেন?
কারণ অনুযায়ী প্রতিরোধ আলাদা। তবে কিছু সাধারণ অভ্যাস সবার জন্যই কাজে লাগে।
- নিয়মিত ঘুম ও খাবার: মাইগ্রেন ও রক্তে চিনির সমস্যা দুটোতেই উপকার।
- পর্যাপ্ত পানি: বিশেষ করে গরমের সময়।
- ধীরে ওঠা: বিছানা বা চেয়ার থেকে উঠে একটু বসে তারপর দাঁড়ান।
- নিজের ট্রিগার চেনা: কোন খাবার, আলো বা পরিস্থিতিতে আক্রমণ আসে, তা খেয়াল রাখুন।
- রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে।
- ওষুধ নিজে বদলাবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হঠাৎ মাথা ঘুরে গেলে কি ব্রেনের সমস্যা? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। কানের ভেতরের সমস্যাই বেশি দেখা যায়। তবে কথা জড়ানো, দুর্বলতা বা তীব্র মাথাব্যথা থাকলে ব্রেনের সমস্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তখন জরুরি চিকিৎসা দরকার।
মাথা ঘোরার সঙ্গে বমি কেন হয়? কানের ভারসাম্য অংশ মস্তিষ্কের যে অংশের সঙ্গে যুক্ত, সেটা বমির কেন্দ্রের কাছেই। ভারসাম্য সংকেত গোলমাল হলে বমি ভাব আসে।
রাতে ঘুম থেকে উঠলেই মাথা ঘোরে, কেন? এটা BPPV-র খুব পরিচিত লক্ষণ। অবস্থান বদলালে কানের কণা নড়ে যায়। তবে রক্তচাপ কমে যাওয়ার কারণেও হতে পারে। পরীক্ষা করালে পার্থক্য ধরা পড়ে।
মাথা ঘোরার ওষুধ নিজে নিজে খাওয়া কি ঠিক? একবার দুবার সাময়িক ওষুধে কাজ হতে পারে, কিন্তু রোজ খেলে মস্তিষ্ক নিজে ভারসাম্য মানিয়ে নিতে পারে না। কারণ না জেনে ওষুধ চালিয়ে যাবেন না।
ঘোরা কি নিজে নিজে ঠিক হয়ে যায়? কিছু ধরন যায়, যেমন ভাইরাসজনিত। কিন্তু বারবার ফিরে এলে বা সপ্তাহ পেরোলেও না কমলে ডাক্তার দেখান।
শেষ কথা
হঠাৎ মাথা ঘোরার পেছনে কান, মাইগ্রেন, প্রেসার, খাবার, ওষুধ, দুশ্চিন্তা বা কখনো স্ট্রোকও থাকতে পারে। তাই প্রতিবার একই ভাবে নেওয়া ঠিক নয়। লক্ষণ হালকা হলে কারণ খুঁজুন, আর বিপদের চিহ্ন থাকলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান। আপনার ঘোরা বারবার ফিরে আসছে? ভার্টিগো চিকিৎসা পেজ থেকে জানুন আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কারণ খুঁজে বের করুন।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫।