Dr. Sajib Saha

ECochG টেস্টের খরচ কত? এই পরীক্ষা কি বাংলাদেশে পাওয়া যায়?

কানে বারবার শব্দ, কান ভারী লাগা, শ্রবণ কমে যাওয়া, আর সাথে মাথা ঘোরার আক্রমণ। এমন রোগীর ডাক্তার মাঝে বলেন, “আপনার ECochG করাতে হতে পারে।” তখন রোগীর মনে দুটো প্রশ্ন আসে: খরচ কত, আর এটা বাংলাদেশে কোথায় পাওয়া যায়?

এই লেখায় সহজ ভাষায় দেখব ECochG টেস্ট কী, কারা করাবেন, কীভাবে হয়, খরচ কীসের ওপর নির্ভর করে, আর সবচেয়ে জরুরি, সঠিক জায়গা কীভাবে খুঁজবেন। আগেই বলে রাখি, সব ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই পরীক্ষা হয় না। তাই যাওয়ার আগে ফোন করে জেনে নেওয়াই ভালো।

ECochG টেস্ট কী?

ECochG-র পুরো নাম ইলেক্ট্রোকক্লিওগ্রাফি। কানের ভেতরে শোনার যে অংশ, যাকে কক্লিয়া বলে, সেখানে শব্দের প্রতিক্রিয়ায় যে ছোট বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়, এই পরীক্ষায় সেই সংকেত মাপা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কানের ভেতরের তরলের (এন্ডোলিম্ফ) চাপ বেড়ে গেলে এই সংকেতের ধরন বদলাতে পারে। তাই মেনিয়ারস ডিজিজের সন্দেহ হলে এটা ব্যবহার হয়।

সহজ করে বললে, কানের ভেতরে পানির মতো তরল থাকে। এর পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে কান ভারী লাগে, শব্দ হয়, শ্রবণ সাময়িকভাবে কমে যায়, আর মাথা ঘোরে। ECochG সেই পরিবর্তনের একটা পরোক্ষ ইঙ্গিত দেয়। কানের ভেতরের বিষয়টা বোঝা সহজ হয় মেনিয়ারস নিয়ে লেখাটা পড়লে: মেনিয়ারস ডিজিজ চিকিৎসা।

ECochG কীভাবে করা হয়?

পরীক্ষার দুটো পদ্ধতি আছে। দুটোর মধ্যে পার্থক্য জানা দরকার, কারণ খরচ, আরাম ও সাবধানতার দিক থেকে দুটো সমান নয়।

এক্সট্রাটিম্পানিক পদ্ধতি: কানের পর্দার বাইরে বা কানের নলের ভেতরে সামনের দিকে একটা সেন্সর বসানো হয়। এতে সুই ফোটানো হয় না। অস্বস্তি তুলনামূলক কম। সংকেত তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে।

ট্রান্সটিম্পানিক পদ্ধতি: কানের পর্দায় হালকা সুই দিয়ে সেন্সর কানের ভেতরের দেয়ালের কাছে পৌঁছানো হয়। এতে সংকেত বেশি পরিষ্কার পাওয়া যায়। কিন্তু এটা অন্তত কিছুটা অস্বস্তির হতে পারে, আর সাধারণত বিশেষ চিকিৎসকের দ্বারা সম্পন্ন হয়।

কোন পদ্ধতিতে হবে, তা ডাক্তার ঠিক করেন। নিজে থেকে কোনটা চাইবেন, তা বলার দরকার নেই। তবে কোন পদ্ধতিতে কী করা হচ্ছে এবং কেন, তা জিজ্ঞেস করার অধিকার আপনার আছে।

কারা এই পরীক্ষা করাতে পারেন?

সব মাথা ঘোরায় এই পরীক্ষা লাগে না। ডাক্তার নিচের পরিস্থিতিগুলোতে এটা বিবেচনা করতে পারেন:

  • মাথা ঘোরার সঙ্গে কানে শব্দ, কান ভারী লাগা ও শ্রবণ কমা একসঙ্গে আছে
  • ঘোরার আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এবং বারবার ফিরে আসে
  • মেনিয়ারস ডিজিজ বা কানের ভেতরের তরল বেড়ে যাওয়ার সন্দেহ আছে
  • অডিওমেট্রিতে একটা কানের শ্রবণ কম দেখা গেছে, কিন্তু কারণ পরিষ্কার নয়
  • শুরুর দিকের লক্ষণ সব মিলছে না, তাই ডাক্তার আরও তথ্য চাইছেন

যাদের ঘোরা শুধু মাথা নড়ালে হয়, শ্রবণ ঠিক আছে, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই ধরনের ঘোরার কারণ হতে পারে BPPV। দেখুন BPPV চিকিৎসা। কোন লক্ষণে কোন পরীক্ষা বেশি কাজে লাগে, তার তুলনা আছে মাথা ঘোরায় কোন টেস্ট কখন করাবেন? লেখায়।

ECochG টেস্টের খরচ কত?

সোজা উত্তর হলো, বাংলাদেশে এর একটা সর্বজনীন দাম নেই। কোনো সরকারি নির্ধারিত মূল্যতালিকাও জানা নেই। যেসব জায়গায় পরীক্ষাটা হয়, সেখানে দাম আলাদা আলাদা হয়। তাই আমি কোনো অনুমানিক সংখ্যা দিচ্ছি না। ভুল সংখ্যা বলার চেয়ে সত্যটা বলা ভালো।

বর্তমান ফি ও সেবার প্রাপ্যতা: [এখানে চেম্বারের বর্তমান ECochG সেবা ও ফি বসান, না থাকলে এই লাইন বাদ দিন]

খরচ যে বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে

  • পরীক্ষার পদ্ধতি: ট্রান্সটিম্পানিক পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ ও আলাদা সরঞ্জাম লাগে, তাই খরচ বেশি হতে পারে
  • যন্ত্র ও সফটওয়্যার: বিশেষ নির্বাচিত ইভোকড পটেনশিয়াল সিস্টেমে পরীক্ষাটা হয়
  • পরীক্ষকের দক্ষতা: অডিওলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভিজ্ঞতা ও ফি
  • কতগুলো পরীক্ষা একসঙ্গে: অডিওমেট্রি ও অন্য পরীক্ষার সঙ্গে প্যাকেজ হলে মোট খরচ বদলায়
  • রিপোর্ট ও ব্যাখ্যা: স্ট্যান্ডার্ড রিপোর্ট, নাকি ডাক্তারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, তা জিজ্ঞেস করে নিন
  • ক্লিনিকের অবস্থান: কোথায় হচ্ছে, সেটার ওপরও দাম নির্ভর করে

দাম জিজ্ঞেস করার সময় যে প্রশ্নগুলো করবেন

  1. ফির মধ্যে কি কি আছে? শুধু পরীক্ষা, না ব্যাখ্যাও?
  2. কোন পদ্ধতিতে করা হবে?
  3. অডিওমেট্রি আলাদা করে দিতে হবে কি?
  4. পরীক্ষা করবেন কে, অডিওলজিস্ট নাকি ডাক্তার?
  5. রিপোর্ট কতদিনে পাওয়া যাবে?

উত্তরগুলো লিখে রাখলে পরে হিসাব মেলানো সহজ হয়।

বাংলাদেশে কি ECochG পাওয়া যায়?

সহজ উত্তর হলো, করা সম্ভব, তবে সব জায়গায় নয়। এই পরীক্ষার জন্য বিশেষ ধরনের যন্ত্র ও প্রশিক্ষিত জনবল লাগে। সাধারণত এই ধরনের জায়গায় সম্ভব হতে পারে:

  • অডিওলজি বা ইউটি বিভাগের বিশেষ ল্যাবসহ বড় হাসপাতাল
  • বিশেষায়িত ভারসাম্য ও ভার্টিগো ক্লিনিক
  • মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ
  • কিছু বড় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্র

তবে প্রতিটা জায়গায় সব সময় সেবাটা চালু থাকে না, আর সেবা বদলাতেও পারে। তাই এখানে কোনো নির্দিষ্ট তালিকা দিচ্ছি না। তালিকা দিলে সেটা পুরনো হয়ে যাবে।

খুঁজতে গিয়ে যা করবেন

১. প্রথমে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন। যিনি আপনাকে পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন, তিনি সাধারণত জানেন কোথায় সেটা হয়।

২. ফোন করে নিশ্চিত হন। জিজ্ঞেস করুন, আপনার নির্দিষ্ট পরীক্ষাটা (ইউটাইম্পানিক নাকি ট্রান্সটিম্পানিক) আজকের দিনই ওখানে হচ্ছে কি না, কত লাগবে, আর রিপোর্টে কী কী থাকবে।

৩. নিজের সব কাগজপত্র সঙ্গে নিন। আগের অডিওমেট্রি রিপোর্ট, পুরনো পরীক্ষা ও ওষুধের তালিকা ডাক্তারকে দেখানো বলে সময় বাঁচে।

২. সম্ভব হলে বিশেষজ্ঞের সরাসরি রেফারেন্স নিন। ভার্টিগো ও ব্যালেন্স ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তিনি বলে দিতে পারেন আপনার ক্ষেত্রে ECochG লাগবে কি না, আর লাগলে কোথায় করাবেন।

একা ECochG দিয়ে কি মেনিয়ারস নিশ্চিত হয়?

না। গবেষণায় দেখা গেছে, ECochG নির্ভুল নয়। কিছু মেনিয়ারস রোগীর ক্ষেত্রে ফল স্বাভাবিক আসতে পারে, আবার কিছু অন্য সমস্যায়ও অস্বাভাবিক ফল পাওয়া যেতে পারে। তাই ডাক্তার সাধারণত লক্ষণ, অডিওমেট্রি ও অন্য পরীক্ষা একসঙ্গে দেখে সিদ্ধান্ত নেন। ফলাফল নিয়ে আজগুবি ধারণা রাখা ভালো না। আর ফল নিয়ে ডাক্তারকে প্রশ্ন করতে দিধা করবেন না।

পরীক্ষার আগে কী করতে হবে?

  • কান পরিষ্কার করার প্রয়োজন হলে চিকিৎসক জানাবেন
  • কানে সংক্রমণ বা ব্যথা থাকলে আগে জানান
  • অ্যালার্জি বা ওষুধের তথ্য ডাক্তারকে বলুন, বিশেষ করে ট্রান্সটিম্পানিক পদ্ধতি হলে
  • সম্ভব হলে সঙ্গে একজন নিন

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ECochG টেস্ট কি ব্যথাদায়ক? পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। ইউটাইম্পানিক পদ্ধতিতে অস্বস্তি কম। ট্রান্সটিম্পানিকে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে।

কতক্ষণ সময় লাগে? পদ্ধতি ও সঙ্গে কয়টা পরীক্ষা আছে, তার ওপর নির্ভর করে। আগে জিজ্ঞেস করে নিন।

ECochG কি সবাই করাতে পারেন? সবাই নয়। কানের পর্দায় ছিঁড়া বা গুরুতর কানের সংক্রমণ থাকলে পদ্ধতি বদলাতে হয়। ডাক্তার আগে কান দেখে নেবেন।

ECochG আর অডিওমেট্রির পার্থক্য কী? অডিওমেট্রিতে আপনি কতটা শুনতে পান, তা মাপা হয়। ECochG-তে কানের ভেতরের বৈদ্যুতিক সংকেত মাপা হয়। দুটো আলাদা স্তরের তথ্য দেয়।

মাথা ঘোরার পরীক্ষা গুলো একসঙ্গে করা যায়? সম্ভব, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলোই করান।

শেষ কথা

ECochG একটি বিশেষায়িত পরীক্ষা, যা সবার প্রয়োজন হয় না। দাম ও পাওয়ার জায়গা ক্লিনিকভেদে বদলায়, তাই যাওয়ার আগে ফোন করে জেনে নিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডাক্তারের সামনে আপনার লক্ষণ সর্বপ্রথমে পরিষ্কার করে বলা, কারণ লক্ষণ দেখেই ডাক্তার ঠিক করেন কোন পরীক্ষা বেশি কাজের। কানের সমস্যায় মাথা ঘোরা বারবার ফিরে আসছে? ভার্টিগো চিকিৎসা পেজ দেখুন আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা করুন।

ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *