মাথা ঘোরা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে অনেক সময় একসঙ্গে কয়েকটা নাম শুনতে হয়: VNG, vHIT, VEMP, ECochG, DVA, SVV। নামগুলো অচেনা, ইংরেজি, আর সবগুলোই ছোট করে লেখা। রোগীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সবগুলো কি লাগবেই? কোনটা কী দেখে? একটা করালেই কি হয়ে যায়?
উত্তরটা হলো, সবার সব পরীক্ষা লাগে না। কোন পরীক্ষা লাগবে, তা নির্ভর করে আপনার লক্ষণের ওপর। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব, প্রতিটা টেস্ট কী মাপে, কখন দরকার হয়, আর কোনটা অন্যটার থেকে কীভাবে আলাদা।
আগে বুঝুন, কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে
আমাদের প্রতিটা কানের ভেতরে ভারসাম্য রাখার একটা ছোট যন্ত্র আছে। এর তিনটা প্যাঁচানো নল আছে, যেগুলো মাথা ঘোরানোর গতি বোঝে। আর দুটো ছোট থলি আছে, যেগুলো সামনে-পেছনে বা ওপর-নিচে সরার অনুভূতি দেয়। এই যন্ত্র থেকে সংকেত স্নায়ু দিয়ে মস্তিষ্কে যায়। মস্তিষ্ক সেই সংকেত দিয়ে চোখকে স্থির রাখে।
একই কানে শোনার অংশও আছে, যাকে কক্লিয়া বলে। তাই কানের সমস্যা হলে কখনো ভারসাম্য অংশে, কখনো শোনার অংশে, কখনো দুটোতেই প্রভাব পড়ে।
প্রতিটা টেস্ট এই ব্যবস্থার আলাদা আলাদা অংশ দেখে। এই কথাটা মনে রাখলে পুরো তুলনা সহজ হয়ে যায়। কারণ কোন অংশ নিয়ে সন্দেহ, সেই অনুযায়ী পরীক্ষা বেছে নেওয়া হয়। কানের ভেতর সমস্যা, নাকি মস্তিষ্কে, সেই ধারণা পেতে পড়ুন ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য।
ছয়টা টেস্ট এক নজরে
| টেস্ট | কী দেখে | সহজ কথায় |
| VNG | চোখের নড়াচড়া | কান ও ভারসাম্য স্নায়ুর কাজ, প্রতিটা কান আলাদা করে |
| vHIT | দ্রুত মাথা ঘোরালে চোখের প্রতিক্রিয়া | তিনটা নলের কাজ কত দ্রুত ও ঠিকভাবে হচ্ছে |
| VEMP | কানের ভেতরের থলির কাজ | সামনে-পেছনে সরার অনুভূতির অংশ |
| ECochG | শোনার অংশের বৈদ্যুতিক সংকেত | কানের ভেতর তরলের চাপ বেশি কি না |
| DVA | চলন্ত অবস্থায় দেখার ক্ষমতা | ভারসাম্য ব্যবস্থা চোখকে স্থির রাখছে কি না |
| SVV | মাথা সোজা রেখে সোজা রেখা বোঝা | শরীর কতটা হেলে আছে, তার অনুভূতি ঠিক কি না |
এবার প্রতিটা আলাদা করে দেখা যাক।
১. VNG: চোখের নড়াচড়া দেখে কান পরীক্ষা
VNG-র পুরো নাম ভিডিওনিস্ট্যাগমোগ্রাফি। আপনি একটা ভিডিও গগলস পরেন। এর ভেতরের ক্যামেরা আপনার চোখের নড়াচড়া রেকর্ড করে। পরীক্ষায় সাধারণত আলোর বিন্দু অনুসরণ করতে বলা হয়, মাথা ও শরীরের অবস্থান বদলানো হয়, আর প্রয়োজনে প্রতিটা কানে হালকা ঠান্ডা বা গরম বাতাস বা পানি দিয়ে ভারসাম্য অংশকে উদ্দীপ্ত করা হয় (একে ক্যালোরিক টেস্ট বলে)।
কখন লাগে: ঘোরা বারবার হলে, কোন কানে সমস্যা বুঝতে হলে, বা BPPV-র মতো অবস্থানজনিত ঘোরায় সন্দেহ থাকলে। এটা সবচেয়ে বেশি করা ভারসাম্য পরীক্ষার একটা। বিস্তারিত পড়ুন VNG টেস্ট পেজে। খরচ ও কোথায় হয়, তা নিয়ে আছে VNG টেস্টের খরচ কত? বাংলাদেশে কোথায় হয়? লেখায়।
২. vHIT: দ্রুত মাথা ঘোরানোর পরীক্ষা
vHIT মানে ভিডিও হেড ইমপালস টেস্ট। এখানে ডাক্তার আপনার মাথা হঠাৎ কিন্তু ছোট গতিতে একদিকে ঘোরান। আপনি একটা নির্দিষ্ট বিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকেন। হালকা গগলস চোখের প্রতিক্রিয়া মাপে। সুস্থ ভারসাম্য ব্যবস্থায় চোখ ঠিকই বিন্দুতে স্থির থাকে। সমস্যা থাকলে চোখ সরে যায় এবং আবার ফিরে আসতে হয়।
এই পরীক্ষায় সময় কম লাগে, আর ক্যালোরিক টেস্টে যেটা ধরা কঠিন, সেই দ্রুত গতির কাজ এখানে দেখা যায়। হঠাৎ তীব্র ঘোরা, যেমন ভেস্টিবুলার নিউরাইটিসে, এটা বেশ কাজে লাগে।
৩. VEMP: কানের ভেতরের থলির পরীক্ষা
VEMP মানে ভেস্টিবুলার ইভোকড মায়োজেনিক পটেনশিয়াল। কানে বিশেষ শব্দ দেওয়া হয়, আর ঘাড় বা চোখের নিচের পেশির ছোট প্রতিক্রিয়া মাপা হয়। এতে কানের ভেতরের দুটো থলির কাজ বোঝা যায়, যা অন্য পরীক্ষায় সরাসরি দেখা যায় না।
কখন লাগে: ঘোরার অন্য পরীক্ষা স্বাভাবিক, কিন্তু সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। অথবা মেনিয়ারস ডিজিজ, ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস বা কানের ভেতরের অন্য সমস্যায় সম্পূর্ণ ছবি পেতে। সাধারণত অন্য পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।
৪. ECochG: শোনার অংশের পরীক্ষা
ECochG মানে ইলেক্ট্রোকক্লিওগ্রাফি। এটা কক্লিয়া থেকে আসা বৈদ্যুতিক সংকেত মাপে। কানের ভেতর তরলের চাপ বেড়ে গেলে (যাকে এন্ডোলিম্ফ্যাটিক হাইড্রপস বলে) এই সংকেতের ধরন বদলায়। তাই সাধারণত মেনিয়ারস ডিজিজ সন্দেহ হলে এই পরীক্ষা করা হয়।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা: গবেষণায় দেখা গেছে, ECochG একা মেনিয়ারস নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এটাকে লক্ষণ, শ্রবণ পরীক্ষা (অডিওমেট্রি) ও অন্য পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। বিস্তারিত পড়ুন ECochG টেস্টের খরচ কত? বাংলাদেশে কি পাওয়া যায়? লেখায়। মেনিয়ারসের চিকিৎসা নিয়ে জানতে দেখুন মেনিয়ারস ডিজিজ চিকিৎসা।
৫. DVA: চলন্ত অবস্থায় দেখার ক্ষমতা
DVA বা ডাইনামিক ভিজ্যুয়াল অ্যাকুইটি টেস্টে প্রথমে স্থির মাথায়, তারপর মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে চার্ট পড়তে হয়। দুই অবস্থার পার্থক্য থেকে বোঝা যায় ভারসাম্য ব্যবস্থা চোখকে স্থির রাখতে পারছে কি না। হাঁটার সময় চারপাশ কেঁপে ওঠে, এমন সমস্যায় এটা কাজে লাগে। পুরো পদ্ধতি, কারা করাতে পারেন ও খরচ নিয়ে লেখা আছে DVA টেস্টের খরচ কত? কারা এই পরীক্ষা করাতে পারেন? এবং DVA টেস্ট পেজে।
৬. SVV: সোজা রেখা চেনার পরীক্ষা
SVV বা সাবজেক্টিভ ভিজ্যুয়াল ভার্টিক্যাল টেস্টে অন্ধকার ঘরে একটা রেখা দেখানো হয়। আপনাকে বলতে হয়, রেখাটা কখন সম্পূর্ণ সোজা মনে হচ্ছে। সুস্থ মানুষ এটা প্রায় ঠিকঠাক বলতে পারেন। কানের থলি বা মস্তিষ্কের কিছু অংশে সমস্যা থাকলে রেখা সোজা বোঝার অনুভূতি একদিকে হেলে যায়। বিস্তারিত দেখুন SVV টেস্ট পেজে।
কোন লক্ষণে কোন টেস্ট বেশি কাজে লাগে?
নিচের তুলনাটা শুধু ধারণার জন্য। কোন টেস্ট করবেন, তা ডাক্তার ঠিক করবেন।
| আপনার সমস্যা | সাধারণত যে পরীক্ষা ভাবা হয় |
| মাথা নড়ালে কয়েক সেকেন্ড ঘোরে | বেডসাইড পরীক্ষা, প্রয়োজনে VNG |
| হঠাৎ তীব্র ঘোরা, বমি, কয়েক দিন চলে | vHIT, VNG |
| ঘোরার সঙ্গে কানে শব্দ ও শ্রবণ কমা | অডিওমেট্রি, ECochG, VEMP |
| হাঁটলে চারপাশ কাঁপে বা ঝাপসা লাগে | DVA, vHIT |
| সোজা দাঁড়াতে গেলেও হেলে যাওয়া অনুভূতি | SVV, VEMP |
| বারবার ঘোরা, কারণ বোঝা যাচ্ছে না | VNG, vHIT, VEMP একসঙ্গে |
সব টেস্ট কি একসঙ্গে করাতে হবে?
না। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরীক্ষা ও এক-দুটো টেস্টেই কারণ বোঝা যায়। BPPV হলে প্রায়ই শুধু বেডসাইড পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে। আবার জটিল বা দীর্ঘদিনের সমস্যায় কয়েকটা টেস্ট মিলিয়ে দেখতে হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করালে খরচ বাড়ে, কিন্তু নতুন কোনো তথ্য আসে না। তাই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন, “এই টেস্ট থেকে কী জানতে চাইছেন?” এই প্রশ্নটা করা আপনার অধিকার।
টেস্টের আগে কী মাথায় রাখবেন?
- ডাক্তারকে আগেই জানান আপনি কী কী ওষুধ খাচ্ছেন। কিছু ওষুধ ফল প্রভাবিত করতে পারে।
- পরীক্ষার আগে কিছু খেতে হবে কি না, চেম্বারে জেনে নিন। কিছু পরীক্ষায় হালকা খেয়ে যেতে বলা হয়।
- আগের সব রিপোর্ট, এমআরআই, অডিওমেট্রি সঙ্গে রাখুন।
- পরীক্ষার সময় বা পরে হালকা ঘোরা বা বমি ভাব হতে পারে। সঙ্গে একজন থাকলে ভালো।
- চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স প্রয়োজন হলে সঙ্গে রাখুন।
টেস্ট স্বাভাবিক এলে কি সমস্যা নেই?
না, তা নয়। মাথা ঘোরার কিছু কারণ, যেমন ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন, রক্তচাপের সমস্যা বা দুশ্চিন্তাজনিত ঘোরা, যন্ত্রের পরীক্ষায় সব সময় ধরা পড়ে না। তখন ডাক্তার লক্ষণ, ইতিহাস ও অন্যান্য তথ্য দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষা স্বাভাবিক হলেও সমস্যা থাকলে ফলো-আপ করুন।
কখন দেরি না করে জরুরি বিভাগে যাবেন?
যদি ঘোরার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত বা পা দুর্বল হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, দুটো করে দেখা বা অজ্ঞান ভাব থাকে, তাহলে টেস্টের কথা ভাবার সময় নেই। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান। কারণ এগুলো স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। কারণ নিয়ে আরও পড়ুন কী কারণে হঠাৎ মাথা ঘোরার আক্রমণ শুরু হয়? লেখায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
VNG আর vHIT-র মধ্যে পার্থক্য কী? VNG ধীর ও দীর্ঘ পরীক্ষা, এতে কান উদ্দীপ্ত করে প্রতিটা কানের কাজ আলাদা দেখা যায়। vHIT দ্রুত, মাথা হঠাৎ ঘুরিয়ে দ্রুত গতির কাজ দেখে। দুটো একে অন্যের পরিপূরক।
ECochG কি শুধু মেনিয়ারসের জন্য? মূলত মেনিয়ারস সন্দেহ হলেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। কানের ভেতরের তরলের সমস্যার ধারণা পেতে এটা সাহায্য করে।
কোন টেস্ট সবচেয়ে ভালো? সবচেয়ে ভালো বলে কিছু নেই। প্রতিটা টেস্ট ভারসাম্য ব্যবস্থার আলাদা অংশ দেখে। আপনার লক্ষণ অনুযায়ী যেটা লাগে, সেটাই ভালো।
টেস্টে কি ব্যথা লাগে? সাধারণত না। কিছু পরীক্ষায় হালকা ঘোরা বা অস্বস্তি হতে পারে, যা অল্প সময় পরে চলে যায়।
টেস্ট করালে কি চিকিৎসা শুরু হয়ে যায়? টেস্ট শুধু কারণ বোঝায়। চিকিৎসা ঠিক হয় ডাক্তারের সিদ্ধান্তে। প্রয়োজনে ওষুধ, ব্যায়াম বা ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শেষ কথা
VNG, vHIT, VEMP, ECochG, DVA ও SVV নামগুলো কঠিন শোনালেও কাজ বোঝা সহজ। প্রতিটা আলাদা অংশ দেখে, আর সব টেস্ট সবার লাগে না। আপনার লক্ষণ, বয়স ও আগের ইতিহাস দেখে ডাক্তার ঠিক করেন কোনটা দরকার। মাথা ঘোরা বারবার ফিরে আসছে? পুরো পরীক্ষা ও চিকিৎসার ধারণা পেতে পড়ুন ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে), আর সঠিক পরিকল্পনার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫। ঢাকার বাইরে থেকে অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনও নেওয়া যায়।