মাথা ঘোরা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে অনেক সময় শুনতে হয়, “আপনার DVA টেস্ট করাতে হবে।” নামটা শুনে অনেকেই ঘাবড়ে যান। কী এই পরীক্ষা? ব্যথা লাগবে কি? খরচ কত? সবাইকে কি করাতে হয়?
এই লেখায় সহজ ভাষায় এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবেন। আমরা দেখব DVA টেস্ট কী, কীভাবে হয়, খরচ কী কী কারণে বদলায়, কারা এটা করাতে পারেন, আর ফলাফল কীভাবে পড়তে হয়।
DVA টেস্ট কী?
DVA-র পুরো নাম Dynamic Visual Acuity, বাংলায় বলা যায় চলন্ত অবস্থায় দেখার ক্ষমতা। কাজটা খুব সহজ। প্রথমে আপনি স্থির মাথা নিয়ে একটা আই চার্ট পড়েন। তারপর মাথা নেড়ে নেড়ে আবার সেই চার্ট পড়েন। দুই অবস্থার পার্থক্য দেখে বোঝা যায় আপনার ভারসাম্য ব্যবস্থা মাথা নড়ার সময় চোখকে স্থির রাখতে পারছে কি না।
একটা উদাহরণ ভাবুন। আপনি হেঁটে যাচ্ছেন, আর রাস্তার সাইনবোর্ড পড়ছেন। সুস্থ মানুষের কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা প্রতি মুহূর্তে চোখকে ঠিক দিকে ধরে রাখে, তাই লেখা ঝাপসা হয় না। এই কাজটার নাম ভেস্টিবুলো-অকুলার রিফ্লেক্স। এই রিফ্লেক্স দুর্বল হলে হাঁটার সময় চারপাশ কেঁপে ওঠে, লেখা পড়া কঠিন হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে অসিলোপ্সিয়া বলে।
ভারসাম্য মাপার আরও পরীক্ষা নিয়ে সাজানো আলোচনা আছে ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে) লেখায়।
পরীক্ষাটা কীভাবে হয়?
পদ্ধতিটা সাধারণত এমন:
- আপনাকে একটা চেয়ারে বসানো হয় এবং সামনে নির্দিষ্ট দূরত্বে চার্ট বা স্ক্রিন থাকে।
- প্রথমে মাথা স্থির রেখে অক্ষর বা চিহ্ন পড়তে বলা হয়। এটা আপনার সাধারণ দেখার ক্ষমতার মাপ।
- এরপর মাথা বাঁয়ে-ডানে বা ওপরে-নিচে নির্দিষ্ট গতিতে নাড়াতে বলা হয়। মাথা নাড়ার সময় আবার পড়তে হয়।
- মাথা স্থির থাকা আর নড়ার সময় আপনি কতটা পড়তে পারলেন, তার তুলনা হয়।
পুরো পরীক্ষা কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়। এতে সুই, ব্যথা বা কোনো ওষুধ লাগে না। মাথা নাড়ার সময় কারও কারও হালকা ঘোরা বা অস্বস্তি হতে পারে। এটা সাময়িক।
ফল কীভাবে পড়া হয়?
সাধারণ নিয়ম হলো, মাথা নাড়ার সময় আই চার্টের কয়েক লাইন কম পড়তে পারলে, বিশেষ করে দুই লাইন বা তার বেশি, সেটাকে ভেস্টিবুলার ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত ধরা হয়। তবে সংখ্যাটা একা কিছু বলে না। ডাক্তার আপনার লক্ষণ, অন্য পরীক্ষা আর বয়স একসঙ্গে ধরে সিদ্ধান্ত নেন।
একটা জরুরি কথা, DVA পরীক্ষা বলে দিতে পারে ভারসাম্য ব্যবস্থায় সমস্যা আছে। কিন্তু কোন কানে, কেন, এই প্রশ্নের উত্তর এটা একা দেয় না। সেজন্য VNG, vHIT বা অন্য পরীক্ষা লাগতে পারে। কোন পরীক্ষা কী কাজ করে, তার তুলনা পাবেন VNG, vHIT, VEMP, ECochG, DVA ও SVV-এর পার্থক্য লেখায়।
DVA টেস্টের খরচ কত?
সরাসরি উত্তর হলো, এর খরচ সব জায়গায় এক নয়। বাংলাদেশে এই পরীক্ষার কোনো সরকার-নির্ধারিত বা সর্বজনীন দাম নেই। বিশেষায়িত ভারসাম্য চেম্বার বা ক্লিনিকে এটা হয়, তাই দাম ক্লিনিকভেদে আলাদা হয়।
বর্তমান ফি জানতে: [এখানে চেম্বারের বর্তমান DVA টেস্ট ফি বসান]
সঠিক খরচ জানতে সরাসরি ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫ নম্বরে ফোন করতে পারেন।
খরচ যে কারণে কমবেশি হয়
- একা DVA, না প্যাকেজ: অনেক সময় DVA একা না করে VNG, vHIT, অডিওমেট্রির সঙ্গে করা হয়। প্যাকেজে সাধারণত আলাদা আলাদা করার চেয়ে মোট খরচ কম পড়ে।
- যন্ত্রের ধরন: কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে ফল বেশি নিখুঁত হয়। সাধারণ আই চার্টে ফল তুলনামূলক কম মান্য।
- ডাক্তারের ফি ও ব্যাখ্যা: ফলের ব্যাখ্যা যিনি করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা দামে প্রভাব ফেলে।
- ক্লিনিকের অবস্থান: ঢাকার নামী এলাকায় সাধারণত খরচ বেশি হয়।
- ফলো-আপ: ভারসাম্য থেরাপির সময় প্রগতি দেখতে একই পরীক্ষা কয়েকবার করা হলে মোট খরচ বাড়ে।
একটা পরামর্শ দিই। কোথাও পরীক্ষা করানোর আগে জিজ্ঞেস করে নিন, দামের মধ্যে রিপোর্ট ও ডাক্তারের পরামর্শ ধরা আছে কি না। এতে পরে হিসাব মেলাতে ঝামেলা হবে না।
কারা DVA টেস্ট করাতে পারেন?
এই পরীক্ষা সবার জন্য লাগে না। নিচের পরিস্থিতিগুলোতে ডাক্তার এটা করাতে বলতে পারেন।
১. হাঁটার সময় চারপাশ কাঁপে বা ঝাপসা লাগে। বাসে চড়লে বা হাঁটলে যদি রাস্তা, দোকানের নাম বা মুখ ঝাপসা লাগে, এটা অসিলোপ্সিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
২. দুই কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা দুর্বল বলে সন্দেহ। কিছু মানুষের দুই কানেই ভারসাম্য যন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়। তখন ঘোরার চেয়ে অসাড় বা অস্থির ভাব বেশি থাকে। এই ক্ষেত্রে DVA বিশেষভাবে কাজে লাগে।
৩. কিছু ওষুধের পর। কিছু ওষুধ কানের ভারসাম্য অংশের ক্ষতি করতে পারে। এমন ওষুধ খাওয়ার পর ভারসাম্যে সমস্যা এলে ডাক্তার এই পরীক্ষা করাতে পারেন। কোন ওষুধ আপনাকে দেওয়া হয়েছে এবং তা চলবে কি না, এটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন। নিজে বন্ধ করবেন না।
৪. ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস বা ভাইরাসজনিত সমস্যার পর। আক্রমণ কমে গেলেও কারও কারও ভারসাম্য পুরোপুরি ফেরে না। DVA দেখায় রিফ্লেক্স এখনও দুর্বল আছে কি না।
৫. ভারসাম্য থেরাপি শুরুর আগে ও পরে। ভেস্টিবুলার রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি চলাকালীন উন্নতি মাপতে এটা সহায়ক হতে পারে। বিস্তারিত দেখুন ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা লেখায়।
৬. পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এমন মানুষ। বয়স্ক মানুষ বা যাঁরা বারবার টলে পড়ে যান, তাঁদের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ব্যবস্থার পুরো ছবি পেতে ডাক্তার এটা যোগ করতে পারেন।
কাদের জন্য সতর্কতা দরকার?
এই পরীক্ষায় মাথা নাড়াতে হয়, তাই ঘাড়ে গুরুতর সমস্যা, তীব্র ঘাড়ব্যথা বা সাম্প্রতিক ঘাড়ে আঘাত থাকলে আগে ডাক্তারকে জানান। কারও দৃষ্টিশক্তি একেবারেই কম হলে চশমা বা লেন্স পরে পরীক্ষা করা হয়, যাতে ফল ঠিক আসে। চশমা সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
পরীক্ষার আগে কী প্রস্তুতি নেবেন?
- নিয়মিত চশমা বা কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে যান
- পরীক্ষার দিন চলমান সব ওষুধের তালিকা সঙ্গে রাখুন
- ডাক্তার আলাদা কিছু না বললে ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না
- হালকা খেয়ে যান, খালি পেটে বা অতিরিক্ত ভরা পেটে নয়
- সঙ্গে একজনকে রাখুন, কারণ পরীক্ষার পর কারও কারও হালকা অস্থিরতা থাকে
পরীক্ষার পর কী হয়?
ফল আসার পর ডাক্তার ব্যাখ্যা করেন কোন ধরনের সমস্যা বেশি সম্ভাব্য। ফল স্বাভাবিক হলে বোঝা যায় রিফ্লেক্স মোটামুটি ঠিক আছে। অস্বাভাবিক হলে আরও পরীক্ষা, ওষুধ বা ভারসাম্য থেরাপি পরিকল্পনা করা হয়। একটা পরীক্ষার ফল দেখে একা কোনো রোগের নাম দেওয়া ঠিক নয়। ছবিটা পরিষ্কার হয় লক্ষণ, ইতিহাস আর কয়েকটা পরীক্ষা মিলিয়ে।
DVA টেস্ট নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা
DVA টেস্ট কি ব্যথাদায়ক? না। এতে সুই বা ওষুধ লাগে না। মাথা নাড়ার সময় অল্প ঘোরা লাগতে পারে।
কতক্ষণ সময় লাগে? সাধারণত কয়েক মিনিট। অন্য পরীক্ষার সঙ্গে করলে মোট সময় বাড়ে।
DVA টেস্ট করালেই কি মাথা ঘোরার কারণ জানা যায়? একা এটা যথেষ্ট নয়। এটা জানায় ভারসাম্য রিফ্লেক্স ঠিক আছে কি না। কোন কানে, কী কারণে, তা জানতে অন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।
বাচ্চারা কি এই পরীক্ষা করাতে পারে? এটা বয়স ও সহযোগিতার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ছোট শিশুদের জন্য পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।
খরচ কমানোর উপায় আছে কি? অনেক সময় প্যাকেজ নিলে আলাদা আলাদা পরীক্ষার চেয়ে কম পড়ে। তবে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাড়ানো ঠিক নয়। ডাক্তার যা বলেন, সেটুকুই করান।
সব মাথা ঘোরায় কি DVA লাগে? না। অনেক BPPV রোগীর এটা লাগে না। বারবার ঘোরা, টলমল ভাব বা ঝাপসা দেখার সমস্যা থাকলে তখন বিবেচনা করা হয়।
শেষ কথা
DVA টেস্ট সহজ, দ্রুত আর ব্যথাহীন একটা পরীক্ষা। হাঁটার সময় চারপাশ কাঁপে বা মাথা নাড়লে দৃষ্টি ঝাপসা হয়, এমন মানুষের ক্ষেত্রে এটা বেশ কাজের। খরচ জানতে সরাসরি চেম্বারে যোগাযোগ করুন, কারণ এটা প্যাকেজ ও যন্ত্রভেদে বদলায়। আপনার সমস্যা কোন ধরনের, সেটা না জানলে ভার্টিগো চিকিৎসা পেজ থেকে শুরু করতে পারেন, আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সঠিক পরীক্ষার পরিকল্পনা করে নিতে পারেন।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫। ঢাকার বাইরে থেকে অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনও নেওয়া যায়।