মাথা ঘোরার জন্য ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিওগুলোর একটা হলো এপলি ম্যানুভার। অনেক রোগী নিজে নিজে করে ভালো হয়ে যান, আবার অনেকে ভুলভাবে করে সমস্যা বাড়িয়ে ফেলেন। পার্থক্যটা তৈরি হয় তিনটা বিষয়ে: আপনার সমস্যাটা সত্যিই BPPV কি না, কোন কানে সমস্যা, আর ধাপগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কি না।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব, এপলি ম্যানুভার কী, কাদের জন্য, বাসায় কীভাবে করবেন, কখন করবেন না, আর কাজ না হলে কী করবেন। শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি: নিশ্চিত ডায়াগনোসিস ছাড়া শুরু না করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
এপলি ম্যানুভার কী?
আমাদের কানের ভেতরে ছোট ছোট ক্যালসিয়াম কণা থাকে। এগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে। কখনো কখনো কণাগুলো সরে কানের ভেতরের একটা পাঁচানো নলে চলে যায়। তখন মাথা নড়ালেই কণাগুলো নড়ে, আর মস্তিষ্ক ভুল সংকেত পায়। ফলে ঘোরা শুরু হয়। এই অবস্থার নাম BPPV।
এপলি ম্যানুভার হলো মাথা ও শরীরকে নির্দিষ্ট কয়েকটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার একটা কৌশল। এতে কণাগুলো ধীরে ধীরে নল থেকে বেরিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। এটা ওষুধ নয়। এটা কণাগুলোকে জায়গামতো ফেরানোর চেষ্টা। BPPV নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন BPPV চিকিৎসা পেজে।
বাসায় করার আগে যা নিশ্চিত হতে হবে
১. সমস্যা কি আসলেই BPPV?
BPPV-র চেনা লক্ষণ হলো:
- মাথা নড়ালে বা পাশ ফিরলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘোরা
- বিছানা থেকে ওঠা বা উপরে তাকানোর সময় ঘোরা
- ঘোরা সাধারণত এক-দুই মিনিটের মধ্যে থেমে যাওয়া
- কানে শব্দ বা শ্রবণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ না থাকা
ঘোরা যদি সারাক্ষণ থাকে, মাথা না নড়ালেও থাকে, সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা দুটো করে দেখা থাকে, তাহলে এটা BPPV নয়। তখন এপলি ম্যানুভার করা তো দূরের কথা, সোজা জরুরি বিভাগে যান। কেন, তা বুঝতে পড়ুন ভার্টিগো কত প্রকার? পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল ভার্টিগোর পার্থক্য।
২. কোন কানে সমস্যা?
এপলি ম্যানুভার ডান আর বাম কানের জন্য উল্টো দিকে করতে হয়। ভুল কানের দিকে করলে কণাগুলো আরও ভুল জায়গায় চলে যেতে পারে। তাই আগে জানতে হবে কোন কান আক্রান্ত। এটা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে ধরা যায় ডিক্স-হলপাইক পরীক্ষায়। কোন কানের কারণে মাথা ঘোরে তা কীভাবে আন্দাজ করবেন, সেটা আলাদা করে লেখা আছে কোন কানের কারণে মাথা ঘোরে, কীভাবে বুঝবেন? লেখায়।
৩. ঘাড় ও পিঠ কি সুস্থ?
এই কৌশলে ঘাড় পেছনে হেলিয়ে শুতে হয়। ঘাড়ে বা পিঠে গুরুতর সমস্যা থাকলে বা সম্প্রতি ঘাড়ে আঘাত পেলে এটা করা উচিত নয়।
কাদের নিজে করা উচিত নয়?
নিচের যেকোনো একটা থাকলে আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন:
- কোন কান আক্রান্ত, তা জানা নেই
- ঘাড়ে ব্যথা, ডিস্ক সমস্যা বা ঘাড় নাড়াতে কষ্ট
- গুরুতর হৃদরোগ বা ঘাড়ের রক্তনালির সমস্যা
- পিঠ বা কোমরে তীব্র ব্যথা
- সাম্প্রতিক মাথায় আঘাত
- ভার্টিগোর সঙ্গে মস্তিষ্কের সমস্যার কোনো লক্ষণ
- বয়স বেশি এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে
আরেকটা কথা। BPPV-র সব ধরন এপলি ম্যানুভারে ঠিক হয় না। এই কৌশল সাধারণত কানের পেছনের নলের (পোস্টেরিয়র ক্যানাল) কণার জন্য। অন্য নলে কণা থাকলে আলাদা কৌশল লাগে। তাই কয়েকবার করেও কাজ না হলে এটাও একটা কারণ হতে পারে।
বাসায় এপলি ম্যানুভার করার ধাপ
নিচের বর্ণনাটা ধরে নিয়েছে যে ডান কান আক্রান্ত। বাম কান হলে সব দিক উল্টে নিন, অর্থাৎ ডানের জায়গায় বাম, বামের জায়গায় ডান।
শুরুর আগে প্রস্তুতি
- নরম বিছানা বা সোফায় বসুন। সম্ভব হলে পাশে কাউকে রাখুন
- বিছানার উপরে ঘাড়ের নিচে একটা বালিশ এমনভাবে রাখুন, যেন শুয়ে পড়লে বালিশটা কাঁধের নিচে থাকে, মাথা নয়
- খালি পেটে বা ভরা পেটে না করাই ভালো
- ওষুধ খেয়ে ঘুম ঘুম ভাব থাকলে করবেন না
ধাপ ১: বসে মাথা ঘোরান
বিছানায় সোজা হয়ে বসুন। পা সামনে ছড়ানো থাকবে। এবার মাথা ডান দিকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি ঘোরান। অর্থাৎ থুতনি ডান কাঁধের দিকে। পুরোপুরি পাশ ফেরার দরকার নেই। অর্ধেকের একটু কম ঘোরালেই হয়।
ধাপ ২: দ্রুত শুয়ে পড়ুন
মাথা ওই অবস্থানেই রেখে পিঠের ওপর শুয়ে পড়ুন। কাঁধ বালিশের ওপর থাকবে, মাথা একটু নিচে ঝুলে থাকবে। চোখ খোলা রাখুন। এই সময় ঘোরা শুরু হবে। সেটা স্বাভাবিক। ঘোরা না থামা পর্যন্ত, কমপক্ষে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট এভাবে থাকুন।
ধাপ ৩: মাথা উল্টো দিকে ঘোরান
মাথা না তুলে ধীরে ধীরে বাম দিকে প্রায় ৯০ ডিগ্রি ঘোরান। অর্থাৎ থুতনি এবার বাম কাঁধের দিকে। আবার ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট থাকুন।
ধাপ ৪: শরীর ও মাথা একসঙ্গে বাঁয়ে ঘোরান
এবার শরীর বাম পাশে কাত করুন, মাথাও একই দিকে ঘুরবে। এখন আপনি বাম পাশে কাত হয়ে আছেন আর মুখ নিচের দিকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি ঘোরানো। ৩০ সেকেন্ড থাকুন।
ধাপ ৫: ধীরে উঠে বসুন
বাম পাশ দিয়েই ধীরে উঠে বসুন। প্রথমে পা বিছানার পাশে ঝুলিয়ে কয়েক মিনিট বসে থাকুন। তারপর দাঁড়ান।
কতবার করবেন?
একবার পুরো ধাপগুলো শেষ করাকেই এক রাউন্ড ধরা হয়। অনেকের একবারেই কাজ হয়। কাজ না হলে সাধারণত দিনে এক সেশনে একবার বা দুইবার করে কয়েক দিন চেষ্টা করা যায়। তবে কয়েকবার করেও যদি ঘোরা না কমে, বারবার করতে থাকবেন না। ডাক্তার দেখান। অতিরিক্ত করলে মাথা ঘোরা আর বমি ভাব বাড়তে পারে।
করার পর কী করবেন?
কিছু বিশেষজ্ঞ করার পর কিছুক্ষণ মাথা সোজা রাখতে বলেন। এ ব্যাপারে নির্দেশ ভিন্ন হতে পারে। সহজ নিয়ম হলো:
- করার পর অন্তত কিছুক্ষণ বসে থাকুন
- মাথা হঠাৎ ঝাঁকাবেন না
- গাড়ি চালাবেন না
- সিঁড়ি বা উঁচু জায়গায় সতর্ক থাকুন
- কয়েক দিন পর্যন্ত হালকা অস্থিরতা থাকতে পারে
আপনার চিকিৎসক যদি আলাদা নির্দেশ দেন, তাহলে সেটাই মানুন।
সাধারণ ভুলগুলো
- ভুল কানে করা। সবচেয়ে বড় ভুল।
- ধাপগুলো খুব তাড়াহুড়ো করে করা। প্রতিটা অবস্থানে অপেক্ষা করা জরুরি।
- মাথা খুব বেশি ঘোরানো বা ঘাড় ঝাঁকানো।
- ঘোরা না থামতেই পরের ধাপে চলে যাওয়া।
- অন্য ধরনের মাথা ঘোরায় এই কৌশল করা।
BPPV-র ক্ষেত্রে সঠিক কানে, সঠিক নিয়মে, বিশেষজ্ঞের হাতে করলে ফল ভালো আসে। অনেক সময় একটা সেশনেই বড় উন্নতি দেখা যায়।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
এই অবস্থায় আর অপেক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের কাছে যান:
- ২-৩ দিন চেষ্টার পরও ঘোরা না কমলে
- ঘোরা বারবার ফিরে এলে
- ম্যানুভার করতে গিয়ে বমি বা তীব্র অসুস্থতা বাড়লে
- কানে শব্দ, শ্রবণ কমা বা কান ভারী লাগা থাকলে
- হাঁটতে গেলে ভারসাম্য সারাক্ষণ ঠিক না থাকলে
একটা জরুরি কথা। যদি ঘোরার সঙ্গে মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়ানো, হাত বা পা অবশ লাগা, তীব্র মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা বা অজ্ঞান ভাব থাকে, তাহলে এটা জরুরি। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান। এপলি ম্যানুভারের কথা তখন ভাববেন না।
ডাক্তার কীভাবে করেন?
বিশেষজ্ঞ প্রথমে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, BPPV-র কোন নল আক্রান্ত আর কোন কান। প্রয়োজনে ভিডিও গগলসে চোখের নড়াচড়া দেখে ধরা হয়। এরপর সঠিক কৌশলে কণাগুলো সরানো হয়। এতে ভুলের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। পরীক্ষা কীভাবে হয় তা নিয়ে আছে ভার্টিগোর পরীক্ষা ও চিকিৎসা (বাংলাদেশে) লেখায়। যাদের ঘোরা বারবার ফিরে আসে বা ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য ভার্টিগো রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসা সহায়ক হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এপলি ম্যানুভার কি নিরাপদ? সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে, সঠিক নিয়মে করলে এটি সাধারণত নিরাপদ। ভুল কানে বা ভুল রোগে করলে সমস্যা হতে পারে।
কোন কান আক্রান্ত না জানলে কী করব? নিজে আন্দাজ করে শুরু করবেন না। পরীক্ষা করিয়ে কান নিশ্চিত করুন।
এপলি ম্যানুভার করলে কি ঘোরা বাড়ে? করার সময় ঘোরা হওয়াই স্বাভাবিক। এটা কণা নড়ছে তার লক্ষণ। তবে ঘোরা অনেকক্ষণ থাকলে বা তীব্র বমি হলে থেমে যান।
কতদিনে ভালো হয়? অনেকের একবারেই উন্নতি হয়। কারও কয়েকবার লাগে। কয়েকদিনেও না কমলে ডাক্তার দেখান।
ভালো হওয়ার পর কি আবার হতে পারে? হ্যাঁ, BPPV ফিরে আসতে পারে। তখন আবার পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো।
গর্ভাবস্থায় বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে কি করা যায়? এই অবস্থায় আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই কাউকে পাশে রাখা জরুরি।
শেষ কথা
এপলি ম্যানুভার কার্যকর, কিন্তু এটা সবার জন্য নয়, আর সব মাথা ঘোরার জন্যও নয়। সঠিক রোগ, সঠিক কান আর সঠিক নিয়ম, এই তিনটা মিললেই তবে এর ফল পাওয়া যায়। নিশ্চিত না হলে নিজে করতে যাবেন না। BPPV চিকিৎসা পেজ থেকে বিস্তারিত জেনে নিন, আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সঠিক পরীক্ষা করান।
ডা. সজীব সাহার চেম্বার: কনসেপ্ট টাওয়ার (৩য় তলা), রুম ৩৩৭ ও ৩৩৮, ৬৮-৬৯ গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ০১৯১৫ ৮৮ ৬৬ ৫৫। ঢাকার বাইরে থেকে অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনও নেওয়া যায়।